প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে রূপে অতুলনীয় আমাদের আখাউড়া পদ্ম বিল

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আমিন উপজেলা প্রতিনিধি আখাউড়া প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:২৪ অপরাহ্ণ
প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে রূপে অতুলনীয় আমাদের আখাউড়া পদ্ম বিল
২৮

প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে রূপে অতুলনীয় এক লীলা ভূমির নাম আমাদের আখাউড়া পদ্ম বিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম নৈসর্গিক পদ্ম বিলের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশ এলাকার প্রকৃতিপ্রেমীরা সেখানে ভীড় জমায়। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে যান সেখানে। বিলের সামনে সেলফি তুলেন।

এ অবস্থায় সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সুরক্ষাসহ পর্যটকবান্ধব পরিবেশ তৈরী করার দাবি জানিয়েছেন প্রকৃতি প্রেমীরা। এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানায়,“পদ্ম বিলের সৌন্দর্যের সুরক্ষাসহ বিলের পাশে পর্যটক বান্ধব পরিবেশ তৈরী করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

পদ্মবিল বিলের অবস্থানঃ- ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত ঘেষা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের ধর্মনগরে পদ্মবিলের অবস্থান। এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলা এবং কসবা উপজেলার মধ্যবর্তী বিশালাকার একটি বিল। স্থানীয়রা পদ্মবিলটিকে ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিল হিসেবে চেনেন। কসবা উপজেলার মানুষের কাছে বিলটি উপজেলার গোসাইস্থল পদ্ম বিল নামেও পরিচিত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে আখাউড়া-কসবা সড়ক হয়ে আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে গিয়ে টনকি কর্মমঠ এলাকায় পৌছাতে হয়। সেখান গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে পদ্মবিলের পথ।

পদ্মফুল ফোটার সময়ঃ- প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে প্রতিবছর বর্ষাকালে পদ্মফুল ফোটা শুরু হয়। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে পদ্মবিল আলোকিত বর্ণিল হয়ে উঠে পদ্মরঙে। আর এই পদ্ম ফুলের সুভাষ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে প্রতি বছরই পদ্ম বিলে জড়ো হয় প্রকিৃতি প্রেমিরা। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর আষাঢ় মাস থেকে বিলে পদ্মফুল ফোটা শুরু হয়। একটানা কার্তিক মাস পর্যন্ত পুরো ৫ মাস পদ্ম ফুলে রঙিন হয়ে থাকে পুরো পদ্ম বিল।

পর্যটকদের চোখে পদ্ম বিলঃ- ঢাকা থেকে পদ্মবিল দেখতে আসা জোনায়েদ হোসেন জানান, আমি আখাউড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। তাদের কাছে পদ্মবিল সম্পর্কে জানতে পেরে লোভ সামলাতে পারিনি। তাই পদ্মবিলটি দেখতে এসেছি। পদ্ম বিলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করে আমি মুগ্ধ। এখানে না আসলে প্রকৃতি যে তার নিজস্ব রূপে ডানা মেলে, তা মিস করতাম। তিনি আরো বলেন, আমাদের প্রকৃতি যে কতো সুন্দর তা মনের ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা। আমি চাই, আমাদের এই সৌন্দর্য যেন কোনো ভাবেই বিবর্ণ না হয়। স্থানীয় প্রশাসন যেন সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

স্থানীয় যুবক কবীর আহম্মেদ জানান, এই পদ্মবিলকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও দূর-দূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে ছুটে আসেন। অনেকেই আসেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। প্রেমিক যুগলরাও আসেন। পদ্মবিলের নৈসর্গিক পরিবেশ অবলোকন করার জন্য পর্যটকেরা ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বিলের মাঝ খানে গিয়ে ছবি তুলেন। তিনি বলেন, এখানে শৌচাগার নেই। পর্যটকবান্ধব পরিবেশ নেই। তিনি এখানে পর্যটক বান্ধব পরিবেশ তৈরী করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

পদ্মের উৎপত্তি ও স্থায়ীত্বকালঃ- ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারী কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনির হোসেন বলেন, হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশ থেকে পদ্মফুলের উৎপত্তি হয়েছে বলে আমরা জানতে পারি। যদি তার বিস্তার সম্পর্কে আমরা বলি, বিভিন্নভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে। পদ্মের বীজ পাখির অত্যন্ত প্রিয় খাবার। তাই পাখির মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। প্রাকৃতিক জলধারার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। যেমন হিমালয় পর্বতমালা থেকে আমাদের বাংলাদেশের ৫৭টি নদী বয়ে চলে এসেছে।

এরবেশির ভাগই চীন, ভারতের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে গেছে। পদ্মের বীজ অর্থাৎ ফুল থেকে যে ফল হয়, ফলের যে বীজ থাকে এটি আমাদের অঞ্চলের নদ- নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে আমাদের এই ভাটি অঞ্চলের বিল-ঝিলে বীজ পতিত হয়ে বংশ বিস্তার করতে পারে। এ ছাড়া তার যে কান্ড, কান্ডের নিচে যে কন্দ বা রাইজম বায়োলজিক্যাল ভাষায় আমরা মূল বলতে পারি। এটির লাইফ টাইমটা অনেক বড়।

পানি চলে গেলেও, যদিও জলাশয় নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু তার যে কন্দ, এটি মাটির গভীরে অনেক দিন জীবিত থাকে। শুস্ক মৌসুমের পর আবার যখন পানি আসে, তখন এটি আবার জারমিনেট করে আবার নতুন পদ্ম গাছ তৈরি হয় এবং তার মধ্যে ফুল আসে। এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে যেমন, মাছের আশ্রয়ের জন্য এটা অনেক উপকারী। মাছ এখানে আশ্রয় নিতে পারে। যদি বিল-ঝিলে ঝোপ না থাকে, তাহলে মাছ গুলো আশ্রয় নিতে পারবে না। ফলে মিঠা পানির মাছ গুলো এখান থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এছাড়া পদ¥ফুল পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাবার। পাখি পদ্মের বীজ খেয়ে জীবন ধারণ করে। পদ্ম বিলুপ্ত হলে পাখির প্রাকৃতিক খাবারও বিলুপ্ত হবে। এতে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পরবে। সব মিলিয়ে ইকোসিস্টেম যেটাকে আমরা বলি, এটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবে পদ্ম বিলকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

এ ব্যাপারে মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক বলেন, প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত ছেলে-মেয়ে, অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে পদ্মবিলের নৈসর্গিক সৈৗন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সার্বিকভাবে ওখানে একটা কমিটি করে দিয়েছি। বিশেষ করে ওই ওয়ার্ডের মেম্বারকে (ইউপি সদস্য) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওই এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গকেও আমরা দায়িত্ব দিয়েছে পর্যটকদের সরক্ষার বিষয়টা দেখাশুনা করার জন্য। একজন গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যাতে কেউ পদ্মফুল ছিড়ে নিয়ে যেতে না পারে। তিনি বলেন, পদ্মবিল একটা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জায়গা। তিনি বলেন, এখানে একটা ওয়াশরুম করে দেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছি।

এ ব্যাপারে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাপসী রাবেয়া বলেন, এখন প্রচুর পদ্ম ফুটেছে, আমি নিজেও গিয়েছি। ওখানে যারা যায়,তারা যেন ফুল না ছিড়ে এমন সাইনবোর্ড টানিয়ে ছিলাম, ব্যানার লাগিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। যার কারণে মানুষ সাইনবোর্ড গুলো উঠিয়ে নিয়ে গেছে। যে যার মতো করে ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছে। আমরা ওখানে একজন গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দিয়েছি। সে আগত মানুষকে ফুল ছিড়তে নিষেধ করে। আমরা চেষ্টা করছি যেন, পদ্মবিলকে কিভাবে আরোও সুরক্ষিত রাখা যায়। পাশাপাশি পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সাথেও কথা বলছি। তিনি বলেন, ভ্রমণ পিপাসু যারা আসেন, তাদের ওয়াশ রুম বা তাদের চেঞ্জিং রুম নেই। এগুলো খুব শীঘ্রই করে দেয়া হবে। ইতো মধ্যেই টেন্ডার হয়ে গেছে।