আমিনবাজার-হেমায়েতপুরে হলমার্কের জব্দকৃত কারখানার অভ্যন্তরে অবৈধ সীসার কারখানা: হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ
রাজধানীর সাভার উপজেলার আমিনবাজার ভাঙ্গা লোহার ব্রিজ সংলগ্ন আলী কোম্পানি এবং তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের হেমায়েতপুরে আলোচিত সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জব্দকৃত সরকারি সম্পদ হলমার্ক গ্রুপের কারখানার অভ্যন্তরে ডজনখানেক অবৈধ কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় পুরাতন ব্যাটারির প্লেট আগুনে পুড়িয়ে সীসা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে চরম জনদুর্ভোগ এবং মারাত্মক পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলা এলাকাটি অনেকটা নীরব থাকলেও সন্ধ্যার পরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠে এসব অবৈধ কারখানা। ট্রাকে করে পুরাতন ব্যাটারির প্লেট, কাঠ ও কয়লা এনে রাতের আঁধারে সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে সীসা তৈরি করা হয়। রাত প্রায় ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলা এই কার্যক্রমে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে কালো ধোঁয়া ও ঝাঁজালো গন্ধ। এর ফলে হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, বলিয়াপুরসহ আশপাশের ২ থেকে ৩ কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
আমিনবাজার এলাকার মোঃ আহসান হাবীব রেজাউল করিমসহ স্থানীয় ১৫-২০ জন বাসিন্দা জানান, রাতের আঁধারে ব্যাটারির প্লেট পোড়ানোর কারণে এসিডের মতো ঝাঁজালো গন্ধে আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এতে বাসাবাড়িতে থাকা শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ধোঁয়ার কারণে চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট ও নানা ধরনের শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কথিত এই অবৈধ সীসা তৈরির কারখানাগুলোর মালিকদের মধ্যে রয়েছেন গাইবান্ধার সাঘাটার মোঃ মানিক সরকার, সাজু মিয়া, রায়হান মীর, এনামুল, মহসিন মিয়া, ফরিদপুরের এনামুল (২) এবং শরীয়তপুরের নাসির মীর।
এ বিষয়ে আমিনবাজার বলিয়াপুর এলাকার কারখানা পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত মোঃ সাজু মিয়া গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, তাদের কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র বা বৈধ কাগজপত্র নেই। তিনি দাবি করেন, হেমায়েতপুর হলমার্ক গ্রুপের ভেতর এবং আমিনবাজার এলাকার কারখানাগুলো মিলিয়ে ১২টি কারখানার মালিকদের কাছ থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা তুলে সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে এসব কারখানা চালানো হচ্ছে। এছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই জব্দকৃত হলমার্ক কারখানার ভেতর অবৈধ কার্যক্রম চালানোর দাবি করেন এক কারখানা মালিক।
সীসা দূষণের ভয়ংকর রূপ ও আন্তর্জাতিক সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং পরিবেশ দূষণ এবং মানুষের শরীরে সীসা প্রবেশের একটি অন্যতম প্রধান উৎস। সীসা মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র, রক্ত, পরিপাকতন্ত্র, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও প্রজনন ব্যবস্থায় মারাত্মক ক্ষতি করে। সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই এবং শিশু ও গর্ভবতী নারীরা এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
ইউনিসেফের (UNICEF) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮.৪ শতাংশের রক্তে এবং গর্ভবতী নারীদের ৭.৫ শতাংশের রক্তে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়া গেছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের ফলে নির্গত ধুলা ও ধোঁয়া শিশুদের মস্তিষ্ক, স্মৃতিশক্তি ও শারীরিক বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও এলাকাববাসীর দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এর আগেও কয়েক দফা এসব কারখানায় অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করলেও কিছুদিন পর অজ্ঞাত কারণে পুনরায় একই স্থানে কারখানাগুলো চালু করা হয়। সরকারি জব্দকৃত সম্পত্তির ভেতরে বহিরাগতদের প্রবেশ, বিদ্যুৎ ও কাঁচামাল সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কথা বললে মালিকপক্ষের লোকজন মামলা ও হামলার ভয় দেখায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অতি দ্রুত এসব অবৈধ সীসা তৈরির কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মালামাল জব্দ এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এ বিষয়ে তারা ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও সাভার উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

