গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চির-চেনা নাপতানি পেশা!
আমাদের সমাজ থেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের প্রাচীন পেশা নাপতানি। এক সময় কাকডাকা ভোরে মানুষের চুল, দাড়িঁ ও গোফঁ কাটার ভীরে সরগরম থাকতো নাপিত বাড়ী। নাপিতরা সাত-সকালে তুলসী তলায় জল ঢেলে সামান্য কিছূ মুখে দিয়ে বাড়ীর উঠাণে বসে পড়তেন চুল-দাড়িঁ ছাটার জন্য। কাক ডাকা ভোর থেকে সকাল দশ-এগারটা পর্যন্ত চলতো কেচিঁর গ্যাচাং গ্যাচাং শব্দ। বৈচিত্রময় শ্যামল বাংলায়, এই দৃশ্য ছিল গ্রাম বাংলার সৌদর্য্যের আরো একটি অপরুপ দৃশ্য।
কখনো কখনো তারা বাড়ী-বাড়ী কিম্বা গ্রাম-গ্রাম ঘুরে নিদিষ্ট একটা পারিশ্রমিকে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেন। সকাল বেলা শান দেওয়া কেচিঁ-আর ধারালো ক্ষূর লাল রংয়ের কাপড়ে প্যাঁচিয়ে বগলে নিচে নিয়ে শনশন করে গৃরস্থের বাড়ীর সামনা দিয়ে হেটেঁ চলার দৃশ্য ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। যা কালের বির্বতনে আজ প্রায় হারিয়ে গেছে।
নাপিতদের এই জীবন চরিৎ ও কর্ম প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সমাজে গুরুত্বপুর্ন। নাপিত কোন জাত নয়, এটি একটি পেশা। নাপিতদের প্রধানকাজ মানুষের চুল, দাড়িঁ ও গোফঁ ছেটে রাখা। সেই অর্থে তাদেরকে নর-সুন্দরও বলা হয়। এটি শব্দটি প্রচলিত শব্দ হলেও এর কোন ব্যাকরনীক ব্যাখা নাই।
কখন কি ভাবে এই নাপিত পেশার উৎপত্তি হয়েছিল তা নিয়ে দ্বি-মত রয়েছে। তবে হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে হরপা দেবীর বিবাহ হলে তার শুচীকর্মের জন্য নাপিতের প্রয়োজন হয়। তখন শিবের নাভিমূল থেকে নাপিতের জন্ম হয়ে বলে শাস্ত্রে প্রচলন রয়েছে। ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় নাপিতদের ছোট জাতের মানুষ মনে করা হয়। কিন্তু এটি সঠিক নয়। জাত বিচারে তারা উচ্চ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত। হিন্দু সমাজে বর্নবাদ প্রথা জাতিতে রুপান্তরিত হওয়ার পর থেকেই ব্রাক্ষণরা নাপিদেরকে ছোট জাতি হিসাবে দেখতে থাকেন। কিন্তু ইতিহাস থেকে জানা যায়, নাপিত একটি শ্রমজীবি পেশা। সেই হিসাবে তারা শ্রদ্ধাবর্ণের মানুষ। আবার অস্ত্রধারী হিসাবে ক্ষত্রিয়, কর্মজীবি হিসাবে বৈশ্য এবং শুভকর্মের সূচনাকারী হিসাবে ব্রাক্ষণর বলা হয়ে থাকে। কোন কোন অর্থে তাদের কে প্রামানিক-স্বাক্ষী, ভান্ডারী-ধারক, শীল-সুশীল, বিশ্বাস-বিশ্বস্ত, মন্ডল-বিচারক, ও দেবনাথ হিসাবেও দেখা হয়।
শাস্ত্রে উল্লেখ, চৈতন্যমহা প্রভূর মস্তক মর্দন করতেন মধুনাপিত। মহাপ্রভু, সচিমাতা ও বিঞ্চুপ্রিয়াকে রেখে যখন সন্ন্যাস ব্রত পালনে উদ্ধত হলে মধুনাপিত কর্মহারা হয়ে হড়েন। মধুনাপিত মহাপ্রভুকে বললেন, যে হাতে আমি ভগবানের মন্ড মদর্ণ করেছি সেই হাত দিয়ে আমি অন্যকারও মন্তক-পাদ করতে পারবো না।
তখন চৈতন্যমহা প্রভু তাকে বর দিলেন, এখন হতে তুমাকে আর কারও পাদ স্পর্শ করতে হবে না। তুমি এবং তোমার বংশের লোকেরা ময়রা-মিষ্টন্ন দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করবে। সেই থেকে মধু নাপিতের বংশধররা মিষ্টির দোকন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
শাস্ত্রে আরো উল্লেখ নরসুন্দর নামের এক নাপিত ছিলেন যিনি নিজের যোগ্যতা ও তন্ত্র সাধনার বলে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। সেই থেকেই নাপিতদেরকে নর সুন্দর বলা হয়।

