জন্মক্রমের আড়ালে অদৃশ্য ক্ষত: পরিবারের ছোট সন্তানেরা কতটা একাকী?
পরিবারের ছোট সন্তান মানেই যেন আজীবনের হাসিখুশি এক ‘ছোট্ট পুতুল’। নানা বাহানা, অবাধ্যতা আর মিষ্টি বায়না দিয়ে যে সারাক্ষণ দখল করে রাখে সবার মনোযোগ। প্রচলিত সামাজিক ধারণা হলো, ছোট সন্তান হওয়া মানেই ‘সব পাওয়ার সুযোগ’ কিংবা অবারিত অধিকার। কিন্তু এই ‘সব পাওয়ার’ চাকচিক্যময় ধারণার আড়ালেই কি লুকিয়ে থাকে অন্য এক বাস্তবতা? আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত আদর আর সুরক্ষার ঘেরাটোপে থাকা ছোট সন্তানের মাঝেই আসলে ভর করতে পারে তীব্র একাকিত্ব এবং এক গভীর মানসিক অতৃপ্তি। পরিবারে জীবনভর একটি নির্ধারিত ভূমিকায় নিজেকে আটকে রাখার লড়াই চালাতে গিয়ে একসময় তাদের মনে ভর করে ক্লান্তি, আর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগের অভাবে দীর্ঘমেয়াদে দেখা দেয় আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।
১৯২০-এর দশকে অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলার সর্বপ্রথম পরিবারে জন্মক্রমের ভিত্তিতে সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। ১৯২৮ সালে তাঁর উপস্থাপিত তত্ত্বে দাবি করা হয়, সন্তানরা একই পরিবারে বড় হলেও তাদের জন্মক্রম আলাদা আলাদা মানসিক বিকাশকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। অ্যাডলারের মতে, পরিবারের সবচেয়ে বড় সন্তান সাধারণত দায়িত্বশীল ও কিছুটা কর্তৃত্বপরায়ণ হয়, কারণ তার ওপর বাবা-মায়ের উচ্চ প্রত্যাশা থাকে। অন্যদিকে, মেজো সন্তান দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী জায়গায় নিজের অবস্থান খোঁজার লড়াই চালায় এবং সবচেয়ে ছোট সন্তানটি বড় হয় এক বিশেষ আদুরে পরিবেশে। তবে এই ‘আদুরে’ পরিচিতিই অনেক সময় ছোট সন্তানের ব্যক্তিত্ব বিকাশে ও স্বাধীন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ছোট সন্তানের অবহেলা বা মানসিক ক্ষতিটা সাধারণত খুব দৃশ্যমান হয় না। তাকে খেতে-পরতে দেওয়া বা আবদার পূরণে কোনো কমতি রাখা হয় না ঠিকই, কিন্তু একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে তার মানসিক সত্ত্বাকে এক প্রকার ‘সূক্ষ্ম অবহেলা’র মধ্য দিয়েই যেতে হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বাবা-মা এবং বড় ভাইবোনেরা প্রায়ই ছোট সন্তানকে অতিরিক্ত আগলে রাখেন। যেকোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে ছোট সন্তানকে আড়ালে রেখে বড়রাই ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। বাহ্যিকভাবে এটিকে ভালোবাসা মনে হলেও, এর ফলে ছোট সন্তানটি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না। বড় হয়েও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, যা দীর্ঘমেয়াদে তার আত্মবিশ্বাসকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইন ডটকমের এক নিবন্ধে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, পরিবার সবসময় আগলে রাখে বলে ছোট সন্তানদের মধ্যে কখনো কখনো একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হয়। তারা নিজেদের ‘অজেয়’ ভাবতে শুরু করে—যেন কোনো বিপদই তাদের স্পর্শ করতে পারবে না। এই অবাঞ্ছিত মানসিকতার কারণে বাস্তব জীবনে বা কর্মক্ষেত্রে তারা অনেক সময় কোনো পরিণতি চিন্তা না করেই হুঁটহাট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে এবং বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হয়।
ফ্যামিলি সিস্টেম থিওরি অনুযায়ী, পরিবার যখন কাউকে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকায় আটকে রাখে, তখন তার মানসিক বিকাশ থমকে যায়। অনেক পরিবারে বয়স ৩০ বা ৪০ পার হয়ে যাওয়ার পরেও ছোট সন্তানকে ‘ছোট’ বা ‘অপরিণত’ হিসেবেই বিচার করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক অবহেলা ব্যক্তির আত্মপরিচয়কে সংকটে ফেলে দেয়। সে সারাজীবন নিজের সক্ষমতা নিয়ে এক অদৃশ্য হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকে।
তাছাড়া ছোট সন্তানকে সাধারণত পরিবারের সবচেয়ে প্রফুল্ল ও হাসিখুশি সদস্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। আর এটাই তার জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক জটিলতা তৈরি করে। তার নিজস্ব কোনো কষ্ট বা বেদনা থাকলেও সে তা সহজে প্রকাশ করতে পারে না, কারণ পরিবার তার কাছ থেকে সবসময় একটি ‘উৎফুল্ল পুতুলের’ মতো আচরণ প্রত্যাশা করে। কষ্ট গোপন করার এই ক্রমাগত মনস্তাত্ত্বিক লড়াই তাকে ধীরে ধীরে তীব্র একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় বড় ভাইবোনদের একে একে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার শূন্যতা। পড়াশোনা, চাকরি বা বিয়ের কারণে ভাইবোনেরা দূরে চলে গেলে ছোট সন্তানটি মানসিকভাবে হঠাৎ একবারে একা হয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সিবলিং লস অব ডেইলি কনট্যাক্ট’। হুট করে ঘরের চেনা পরিবেশ বদলে যাওয়া এবং বাবা-মায়ের বার্ধক্যের ছায়ায় নিজেকে আবিষ্কার করার এই অভিজ্ঞতা ছোট সন্তানের নিঃসঙ্গতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
জন্মক্রমের এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে ছোট সন্তানের একাকিত্বের পাশাপাশি মেজো বা মাঝখানের সন্তানের সংকটকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মিডল চাইল্ড সিনড্রোম’। বড় সন্তানকে নিয়ে থাকে বাবা-মায়ের প্রথম আবেগ ও উচ্চাশা, আর ছোট সন্তান পায় অফুরন্ত আদর। মাঝখানে থাকা মেজো সন্তানটি প্রায়শই এক ধরনের মনোযোগের ঘাটতিতে ভোগে। তার মনে হতে থাকে, সে বুঝি পরিবারের সবার অলক্ষ্যে রয়ে গেছে। মেজো সন্তানদের সাধারণত বড় ভাইবোনের পুরনো জামাকাপড় বা বইপত্র ব্যবহার করে বড় হতে হয়, যা তাদের মধ্যে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার তীব্র ক্ষুধা তৈরি করে। তবে এই সংকটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পরিবারে বড় ও ছোটর দ্বন্দ্বে মেজো সন্তানরাই সবসময় শান্তিকামী ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। ফলে বাস্তব জীবনে তারা চমৎকার কূটনৈতিক বুদ্ধি, বাস্তববাদী চিন্তাভাবনা এবং যেকারো সাথে সহজে মানিয়ে নেওয়ার এক অনন্য ক্ষমতা অর্জন করে।
যদিও কিছু আধুনিক বড় পরিসরের গবেষণায় দাবি করা হয়েছে যে জন্মক্রমের কারণে ব্যক্তিত্বে কোনো স্থায়ী প্রভাব পড়ে না। বরং পারিবারিক অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ এবং সন্তান লালন-পালনের ধরনই মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। ছোট সন্তান হয়ে জন্মানো মানেই সে সারাজীবন একা থাকবে বা মেজো সন্তান মানেই সে বিচ্ছিন্ন হবে বিষয়টি এমন নয়। তবে শৈশবে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়ার নামে সন্তানের ডানা ছেঁটে দেওয়া, কিংবা অবহেলার ছলে তাকে প্রতিনিয়ত বড়দের সাথে তুলনা করা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি করতে পারে। পরিবারের প্রতিটি সন্তানকে তার জন্মক্রম নির্বিশেষে একজন স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করাই হোক সুস্থ পারিবারিক আবহের মূল ভিত্তি।

