সিংগাইরে “৩৪কোটি টাকার সেতুর ডেক স্ল্যাবে ফাটল, তবু ‘সমস্যা নেই’ বলছে উপজেলা প্রকল্প ইঞ্জিনিয়ার”

কামরুল হাসান, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ): প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
সিংগাইরে “৩৪কোটি টাকার সেতুর ডেক স্ল্যাবে ফাটল, তবু ‘সমস্যা নেই’ বলছে উপজেলা প্রকল্প ইঞ্জিনিয়ার”
১৮৭

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চান্দহর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর ডেক স্ল্যাবে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই এমন দৃশ্য সামনে আসায় সেতুর নির্মাণমান, তদারকি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ধীরগতির কাজ, বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে “স্বাভাবিক” বলেই দাবি করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চান্দহর বাজারসংলগ্ন নির্মাণাধীন সেতুর ডেক স্ল্যাবের বিভিন্ন স্থানে লম্বালম্বি ও আড়াআড়িভাবে ফাটল তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও ফাটল এতটাই স্পষ্ট যে খালি চোখেই তা সহজে বোঝা যায়। স্থানীয়দের দাবি, ঢালাইয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই এসব ফাটল দৃশ্যমান হয়। অথচ কাজের মান যাচাই কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরায় ঢালাইয়ের উদ্যোগ না নিয়ে দায়সারাভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, এই সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়; বরং সিংগাইরের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের প্রধান যোগাযোগের ভরসা। তাই নির্মাণের শুরু থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেতুর কাজ শেষ না হওয়া এবং এখন মূল কাঠামোতেই ফাটল দেখা দেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রায় ৩৪ কোটি ৮৬ লাখ ৩৩ হাজার ৫৩০ টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করে মেসার্স নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। দুই বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়।

এরপরও কাজ অসমাপ্ত রেখে ২০২১ সালের ৩০ জুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সরে যায়। পরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। পুনরায় কাজের দায়িত্ব পায় ফরিদপুরভিত্তিক জান্নাত কনস্ট্রাকশন। নতুন করে একই ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হয়ে আরও পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি ছাড়াই নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
নির্মাণকাজে ফাটলের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. সাজিদুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করলেও একে বড় কোনো ত্রুটি হিসেবে মানতে রাজি নন। তিনি বলেন, “ঢালাইয়ের পর এ ধরনের সামান্য ফাটল হতে পারে। এটা বড় কোনো সমস্যা নয়। মেডিসিন বা কেমিক্যাল গ্রাউটিং করলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

তবে তার এই বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর মূল কাঠামোতেই যদি ফাটল দেখা দেয়, তাহলে শুধু কেমিক্যাল ব্যবহার করে কতটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব?
সেতুর কাজ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিংগাইর এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন,
“এটি কোনো ফাটল নয়, মূলত ‘এয়ার স্যাক’ (Air Sac)। রোদের তাপমাত্রা বেশি থাকার কারণে কংক্রিটের উপরিভাগ কিছুটা ফেটেছে। এর ওপরে যখন আমরা আরও একটি সারফেস লেয়ার করব, তখন এগুলো আর দেখা যাবে না।”

তবে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ডেক স্ল্যাব একটি সেতুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে ফাটল সৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানি ও আর্দ্রতা সহজেই ভেতরের রডে পৌঁছে যেতে পারে। এতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রডে মরিচা ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপ ও কম্পনের কারণে ফাটল আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেও মত তাদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কেমিক্যাল প্রয়োগ করে ফাটল ঢেকে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। ফাটল কেন সৃষ্টি হয়েছে, তা নির্ণয়ে স্বাধীন কারিগরি তদন্ত জরুরি। প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণেরও সুপারিশ আসতে পারে।

চান্দহর বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বছরের পর বছর ভোগান্তি সহ্য করেও তারা একটি নিরাপদ সেতুর আশায় ছিলেন। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই সেতুর ডেক স্ল্যাবে ফাটল দেখা দেওয়ায় এখন সেই স্বপ্ন নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, পুরো প্রকল্পের নির্মাণমান নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত না করা পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের আশঙ্কা, যথাযথ তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই সেতুই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।