সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে গাজীপুরে শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ, স্তব্ধ যান চলাচল

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:০৯ অপরাহ্ণ
সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে গাজীপুরে শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ, স্তব্ধ যান চলাচল
৫১

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন নতুন করে ব্যাপক উত্তেজনাকর রূপ নিয়েছে। সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরের ভোগড়া, কলম্বিয়া বাইপাস এবং কোনাবাড়ীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা একযোগে রাজপথে নেমে এসেছেন। শ্রমিকদের টানা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে। এতে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়ে সাধারণ যাত্রী ও দূরপাল্লার পরিবহন চালকদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
আন্দোলনকারী শ্রমিকরা জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম ও ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনসংগ্রাম চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে বেঁচে থাকার মতো একটি সম্মানজনক জীবনযাত্রার উদ্দেশ্যে শ্রমিকরা তাঁদের সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার জোর দাবি জানিয়েছেন। এই ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক একত্রিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
পরিস্থিতি নিয়ে শ্রমিক ফেডারেশনের এক শীর্ষ নেতা জানান, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির যৌক্তিক দাবি সম্পর্কে ইতিমধ্যে কারখানা মালিকদের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়েছে। শ্রমিকদের সার্বিক মানবেতর জীবনযাত্রার কথা চিন্তা করে তাঁদের এই ন্যায্য দাবি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা এবং দ্রুত একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও সম্মানজনক সমাধানের পৌঁছানোর জন্য মালিকপক্ষের প্রতি জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে কারখানার মালিকপক্ষ বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের দাবি, শিল্পখাতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, সার্বিক উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে আনুষঙ্গিক উপকরণের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণে কারখানা পরিচালনা করা এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর পক্ষে একলক্ষে সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা বেতন প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে একটানা উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে শিল্প উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক ও স্থানীয় ব্যবসায় টিকে থাকতে চরম হিমশিম খাবেন, যা পরবর্তীতে অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
শিল্পাঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের সবসময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে আন্দোলনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সাথে বিশৃঙ্খলা এড়াতে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনে টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহার করে মহাসড়কে যান চলাচল ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তৈরী পোশাক খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একাধারে শ্রমিকের বেঁচে থাকার উপযোগী ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা এবং অন্যদিকে দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার সার্বিক উৎপাদন ও লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সচল রাখা—এই দুটি বিষয়কেই সমান প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে সরকার, কারখানা মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
গাজীপুরের পোশাক শিল্পাঞ্চলের বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক মান নিশ্চিতকরণ এবং তৈরি পোশাক খাতের টেকসই ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে সরকার, মালিক ও শ্রমিক নেতৃত্বের তাৎক্ষণিক সমঝোতাই হতে পারে সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।