আজ ৩০ অক্টোবর, নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক হামলার দশ বছর

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আমিন উপজেলা প্রতিনিধি আখাউড় প্রকাশিত: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১২ অপরাহ্ণ
আজ ৩০ অক্টোবর, নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক হামলার দশ বছর
২৬

আজ ৩০ অক্টোবর। ২০১৬ সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার দশ (১০) বর্ষপূর্তি। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই ঘটনার ক্ষত, আতঙ্ক ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এখনো ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে রয়ে গেছে।

২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর ছবি প্রকাশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নাসিরনগরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রসরাজ দাস নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে অভিযোগ ওঠার পর উপজেলা সদরে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়। একপর্যায়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ১৫টি মন্দির এবং শতাধিক হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা তিন শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় সংগ্রাম করতে হয়।

এ ঘটনার পর মোট আটটি মামলা দায়ের হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ একটি মামলায় ১৩ জনকে চার বছর করে কারাদণ্ড দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালত। এটি ছিল নাসিরনগরের হামলার ঘটনায় প্রথম উল্লেখযোগ্য রায়। তবে ওই সময় পর্যন্ত বাকি মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়নি।

২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয়টি মামলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে বিচারাধীন ছিল এবং রসরাজ দাসের বিরুদ্ধে করা মামলাটি চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছিল। ফলে হামলার দশম বর্ষপূর্তিতে বিচারপ্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি জানাও জরুরি।

তবে নাসিরনগরের ঘটনার সূত্রপাতের সঙ্গে রসরাজ দাসের নাম জড়িয়ে যায়। ধর্ম অবমাননাকর ছবি ফেসবুকে প্রকাশের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় তাঁকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রসরাজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, মুঠোফোন ও মেমোরি কার্ডে সংশ্লিষ্ট ছবির অস্তিত্ব পায়নি পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ। অন্যদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এ নিয়ে রসরাজের আইনজীবী ও তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্যেও ভিন্নতা উঠে আসে।

একজন সাধারণ জেলে রসরাজের দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই তাই শুধু একটি মামলার বিষয় নয়; এটি তদন্তের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় একজন নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে আনে।

দশ বছর পরও যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
নাসিরনগরের হামলা কেবল বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ছিল না; এটি ছিল মানুষের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আইনের শাসনের ওপর গুরুতর আঘাত। কোনো গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা নিরীহ মানুষের ওপর হামলার বৈধতা দিতে পারে না।

দশ বছর পরও তাই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে- হামলার পরিকল্পনাকারী ও প্রত্যক্ষ হামলাকারীদের সবাইকে কি বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে? ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কি যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা পেয়েছে? রসরাজ দাসের মামলার চূড়ান্ত পরিণতি কী? ভবিষ্যতে এমন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে কী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হামলার পর ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি ও মন্দির পুনর্নির্মাণ নয়; বরং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সব নাগরিকের সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।

আজ ভয়াল ৩০ অক্টোবরের দশম বর্ষপূর্তিতে নাসিরনগরের ভুক্তভোগী মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়ে দাবি উঠুক—সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত হোক। ধর্ম-বর্ণ-পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। আর কোনো রসরাজ, কোনো পরিবার কিংবা কোনো সম্প্রদায় যেন ন্যায় বিচার ও নিরাপত্তার অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটাতে বাধ্য না হয়।