বাউবির ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত: প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষায় জোর
অত্যন্ত আনন্দঘন ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১০টায় গাজীপুরের বোর্ডবাজারে অবস্থিত বাউবির সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন মূল ক্যাম্পাসে এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দিনব্যাপী নানা গঠনমূলক কর্মসূচির আয়োজন করে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বিশেষ আয়োজনে শিক্ষার সুযোগ দেশব্যাপী আরও সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম জোরদারকরণ, গবেষণার সুদূরপ্রসারী প্রসার এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে একটি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
দিনব্যাপী আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সুযোগ্য চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বাউবির প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান। অনুষ্ঠানের মুখ্য আলোচক হিসেবে মূল্যবান আলোচনা পেশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও জমকালো এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান।
বুধবার সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পতাকা এবং বাউবির অধীনে থাকা সাতটি স্কুলের পৃথক পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা অবমুক্তকরণ এবং বেলুন উড্ডয়নের মাধ্যমে প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী মূল অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এই বিশেষ দিন উপলক্ষে ক্যাম্পাসে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ র্যালি বের করা হয় এবং দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনী ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। মূল অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্য ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির সফল সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল স্তরের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ও বর্তমান কার্যক্রমের পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, বাউবির প্রধান উদ্দেশ্য কেবল কাগুজে সনদ প্রদান হওয়া উচিত নয়, বরং প্রচলিত ধারার শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা এবং তাদের জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার এক অবারিত সুযোগ নিশ্চিত করাই হলো এই প্রতিষ্ঠানের মূল দর্শন। এ জন্য তিনি গত ৩৪ বছরের প্রকৃত অর্জন, প্রদত্ত শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের অবদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও তথ্য-উপাত্তভিত্তিক মূল্যায়নের তাগিদ দেন। শিক্ষামন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অন্যান্য প্রচলিত ধারার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অহেতুক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষার নিজস্ব অনন্য বৈশিষ্ট্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, সম্পূর্ণ কর্মমুখী এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সময়োপযোগী মানোন্নয়ন, পরীক্ষায় যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও নকল কঠোরভাবে প্রতিরোধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যথাযথ ও ইতিবাচক ব্যবহারের ওপরও জোর দেন।
শিক্ষামন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে একটি দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে হলে কারিগরি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই। এই মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান সকল অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধার সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং আধুনিক গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সবশেষে তিনি বাউবির শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এবং বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আধুনিক, মানসম্মত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানেই শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবপ্রতিষ্ঠিত ‘ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং’ (আইটিভিইটি)-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে বাউবির বিভিন্ন প্রোগ্রামে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অসামান্য কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী ৯ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে প্রথমবারের মতো অত্যন্ত সম্মানজনক ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত তৃতীয় লিঙ্গের একজন শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষাক্ষেত্রে কৃতিত্বের বিশেষ স্বীকৃতিস্বরূপ একটি সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করে সমাজকে এক ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান গর্বের সঙ্গে বলেন, দীর্ঘ ৩৪ বছরের সফল পথচলায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় একটিমাত্র অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রাম থেকে শুরু করে বর্তমানে ৫৫টি ভিন্ন ভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালনাকারী এক বিশাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় এখন শুধু শিক্ষার্থীসংখ্যা ঢালাওভাবে বৃদ্ধি বা সনদ প্রদানের পরিবর্তে জ্ঞাননির্ভর, সম্পূর্ণ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, দক্ষতাভিত্তিক এবং একটি উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা দেশব্যাপী সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই লক্ষ্যে তিনি আইটি-সংক্রান্ত নানা নতুন উদ্যোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গ্রাফিক ডিজাইন, আধুনিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুবিধার্থে কোরিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষাসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী কর্মমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, প্রথমবারের মতো ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব সাফল্য অন্য সকল শিক্ষার্থীকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে।
অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, গত ৩৪ বছরে বাউবি কর্মজীবী মানুষ, নারী, প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অভাবনীয় ও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। তিনি বাউবির শিক্ষাব্যবস্থাকে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃতি লাভের প্রশংসা করেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বাউবির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে মানসম্মত ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের বিশাল সুযোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং এর প্রথম চ্যান্সেলর বেগম খালেদা জিয়ার অসামান্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানটির অতীত অর্জন, বর্তমানের বিশাল সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে নতুনভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছে। সনাতনী শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সমান সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করার যে দৃঢ় অঙ্গীকার বাউবি করেছে, তা দেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করবে।









