নিয়ম নয়, ভাড়া ঘরই যোগ্যতা! রাজশাহীর দুর্গাপুরে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
রাজশাহীর দুর্গাপুরে বন্ধ পাবলিক গ্রন্থাগারের সামনে ঝোলানো 'মেসার্স তারেক ট্রেডার্স' এর সারের সাইনবোর্ড।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য জনসমক্ষে বেরিয়ে এসেছে। কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সার ডিলারশিপ বাগিয়ে নিতে প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী একটি পাবলিক গ্রন্থাগারকে রাতারাতি সারের গুদাম হিসেবে দেখিয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এমন একটি অবাস্তব ও বিতর্কিত আবেদন ইতিমধ্যেই উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রাথমিক ধাপ পার করে সুপারিশসহ জেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই অভিনব প্রতারণার ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সুধীমহল ও সাধারণ কৃষকদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই জালিয়াতির কেন্দ্রস্থল হলো দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের অন্তর্গত কালীগঞ্জ বাজার। সরেজমিনে ওই এলাকায় অনুসন্ধান করতে গিয়ে এক হতাশাজনক চিত্র চোখে পড়ে। বাজারের যে নির্দিষ্ট ঘরটিতে দীর্ঘ তিন দশক ধরে একটি পাবলিক গ্রন্থাগার পরিচালিত হয়ে আসছিল, যেখানে স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের অগণিত শিক্ষার্থী নিয়মিত বই পড়তে আসতেন এবং জ্ঞান চর্চা করতেন, সেই ঐতিহ্যবাহী ঘরটি এখন পুরোপুরি তালাবদ্ধ। আর সেই বন্ধ দরজার ঠিক সামনেই অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘মেসার্স তারেক ট্রেডার্স, সার বিক্রয় কেন্দ্র’ নামের একটি নতুন ঝকঝকে সাইনবোর্ড।
এ বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললে তারা তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, তারা যখন স্কুলে পড়তেন, তখন নিয়মিত এই লাইব্রেরিতে এসে বিভিন্ন বই পড়তেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গত কয়েক বছর ধরে কোনো এক অজানা কারণে এই জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষিকাও এই লাইব্রেরিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছায়াতলে থাকা একটি লাইব্রেরি কীভাবে হঠাৎ বাণিজ্যিক গুদামে পরিণত হলো, তা নিয়ে জনমনে বিস্তর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দরজায় ঝোলানো ওই বিতর্কিত সাইনবোর্ডের মালিকের নাম মো. সাইদুর রহমান। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ওই জায়গাটি আগে সত্যিই একটি পাবলিক গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি দাবি করেন, ঘরটি ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি এবং তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে সেটি যথাযথভাবে ভাড়া নিয়েছেন। যদিও তিনি নিজে পেশাগতভাবে কোনো নিয়মিত ব্যবসায়ী নন এবং মাঝে মাঝে কেবল আলুর ব্যবসা করেন বলেও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। একজন অনিয়মিত ব্যবসায়ী কীভাবে এমন একটি স্পর্শকাতর ডিলারশিপের জন্য আবেদন করলেন, তা নিয়েও রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এই সাইদুর রহমান হলেন দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব অধ্যাপক মো. জোবায়েদ হোসেনের আপন ভাই। রাজনৈতিক ক্ষমতার এই শক্ত বলয়কে কাজে লাগিয়ে এবং প্রচলিত আইন ও নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা না করেই তিনি তার ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানকে সারের ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ক্ষমতার দাপটে একটি বন্ধ গ্রন্থাগারকে গুদাম দেখানোর দুঃসাহস তিনি এ কারণেই দেখাতে পেরেছেন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
এই চরম অনিয়মের বিষয়ে জয়নগর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অনেকটা দায়সারাভাবে জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি এই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করছে। সাইদুর রহমান যেহেতু ঘর ভাড়ার এগ্রিমেন্ট বা চুক্তিপত্র জমা দিয়েছেন এবং ঘরটির মালিকানা সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে, তাই নিয়ম মেনেই তাকে ডিলারশিপের প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় আইনি ও যৌক্তিক প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। সরকারি সুস্পষ্ট নিয়ম অনুযায়ী, সার সংরক্ষণের জন্য একটি উপযোগী পরিবেশ, আর্দ্রতামুক্ত স্থান এবং পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি প্রকৃত গুদাম থাকা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। এমন কঠোর শর্ত থাকা সত্ত্বেও একটি দীর্ঘদিনের বন্ধ গ্রন্থাগার, যেখানে সারের কোনো অস্তিত্বই নেই, সেটি কীভাবে উপজেলা কমিটির কাছে সার সংরক্ষণের যোগ্য গুদাম হিসেবে বিবেচিত হলো?
সার্বিক বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা ফারজানার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি আবেদন মাঠে গিয়ে তদন্ত করতে পারেননি। কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই জেলা প্রশাসকের কাছে নামের তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, জেলা পর্যায় থেকেও এই তালিকাগুলোর পুনরায় কঠোর যাচাই-বাছাই করা হবে। অন্যদিকে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী দাবি করেন, নিয়ম মেনেই সবকিছু করা হয়েছে। তিনি ওই ঘরটিকে পাবলিক গ্রন্থাগার বলতেও নারাজ। তার মতে, মালিকানা ও চুক্তির ভিত্তিতেই তালিকা তৈরি হয়েছে, তবে এই তালিকা এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
কৃষক ও স্থানীয় সচেতন মহলের অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি হলো, সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি নিছক কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি নয়, এটি সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের সেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি অসাধু চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যদি ভুয়া গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ পেয়ে যায়, তবে প্রান্তিক কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়বেন। তাই বিতর্কিত এই আবেদনটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের আগেই গুদামের প্রকৃত অস্তিত্ব, অতীত ইতিহাস এবং আবেদনকারীর ব্যবসায়িক যোগ্যতা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সরেজমিনে যাচাই করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

