ভালোবাসার ছদ্মবেশে যৌতুকের ভয়াবহ ফাঁদ: সন্তান ও সর্বস্ব হারিয়ে আদালতের দ্বারে পোশাকশ্রমিক শাহনাজ
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থের পুরোটাই পরম বিশ্বাসে স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন এক অসহায় নারী। মনে আশা ছিল, কঠোর পরিশ্রমের পর সংসারে হয়তো একটু সুখের মুখ দেখতে পাবেন। তবে ভালোবাসার মিষ্টি আড়াল ও সংসারের ছদ্মবেশে তাঁর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল এক ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় যৌতুকের ফাঁদ। পাশবিক যৌতুকের নিষ্ঠুর বলি হয়ে গর্ভের সন্তানকে অকালে হারানো, তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বস্ব হারিয়ে বিচারের আশায় আদালতের দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন শাহনাজ আক্তার (২৫) নামের এক সংগ্রামী পোশাকশ্রমিক। গাজীপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩-এর নথিপত্র (সি.আর মামলা নং- ২৯১/২০২৬, থানা- গাছা) এবং অনুসন্ধানী গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে এক হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ নির্যাতনের লোমহর্ষক বাস্তবতা।
অনুসন্ধানের বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ২৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে ১০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া এলাকার অধিবাসী মো: হৃদয় মিয়ার (২৫) সঙ্গে ধর্মীয় বিধি মোতাবেক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন টাঙ্গাইলের মেয়ে শাহনাজ। শাহনাজ গাজীপুরের গাছা এলাকার একটি পোশাক কারখানায় দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম ও ওভারটাইম করে মাসে প্রায় ২৭,০০০ টাকা আয় করতেন। বিবাহের পর শাহনাজ অন্তঃসত্ত্বা হলে এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েন। তবে অভিযোগ রয়েছে, পাষাণ স্বামী হৃদয় তাকে পরিকল্পিতভাবে ভুল বুঝিয়ে এবং জোরপূর্বক গর্ভপাতের ক্ষতিকর ওষুধ খাইয়ে তাঁর গর্ভের সন্তানকে হত্যা করে।
সন্তান হারানোর চরম শোকের পরও সংগ্রামী এই নারীর ওপর নির্যাতনের মাত্রা একটুও কমেনি। পেশায় গার্মেন্টস কর্মী শাহনাজের কষ্টার্জিত সমস্ত উপার্জন নিয়মিত হাতিয়ে নিয়েও ক্ষান্ত হয়নি লোভী স্বামী হৃদয়। সে নতুন করে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা যৌতুকের দাবিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। স্বামীর কথামতো শাহনাজ নিজের জমানো ৪ লাখ টাকা তুলে দেন তার হাতে। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, এই অর্থ কোনো বৈধ ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে জুয়া, মদ, গাঁজা ও মারাত্মক নেশার পেছনে উড়িয়ে দেয় হৃদয়। এরপর গত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আরও ৪ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এতে অসম্মতি জানালে আটার বেলন দিয়ে শাহনাজকে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং ওই রাতেই ঘরের ড্রয়ার থেকে নগদ ৯০,০০০ টাকা ও মহামূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে চম্পট দেয় পাষাণ হৃদয়।
স্বামীর কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে শ্বশুরবাড়িতে উপস্থিত হলে তাকে পরিবারে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান শ্বশুর মো: নুরুল ইসলাম (৫৫) ও শাশুড়ি মোছা: মরিয়ম (৪৫)। সেখানে শানাহাজের চুল টেনে ধরে জামাকাপড় ছিঁড়ে তাকে উঠানে ফেলে অমানুষিক ও বর্বরোচিতভাবে পেটাতে থাকেন তারা। স্থানীয় প্রতিবেশীরা মারাত্মক ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে ন্যায়বিচারের আশায় গত ২১ মে ২০২৬ তারিখে গাজীপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৩ নং আদালতে যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮-এর ৩ ধারায় একটি নালিশী আবেদন দায়ের করেন শাহনাজ। বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো: রাকিবুল হাসান বাদীনির জবানবন্দী গ্রহণ করে অভিযুক্ত মো: হৃদয় মিয়ার বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ আমলে নেন এবং তার বিরুদ্ধে আদালতের পক্ষ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা (W/A) ইস্যু করেন।
আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও সুযোগসন্ধানী আসামী হৃদয় মিয়া গ্রেফতার এড়াতে কৌশলে আত্মগোপন করেন এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেন। এ খবর পেয়ে শাহনাজ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে আসামী যেন কোনোভাবেই দেশ ছাড়তে না পারে, সে মর্মে লিখিত আবেদন জানান। আদালতের সর্বশেষ আদেশে জানানো হয়, গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল হয়ে ফেরত না আসায় বিজ্ঞ আদালত নিশ্চিত হয়েছেন যে আসামী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত আসামীর বিরুদ্ধে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নির্ধারিত তারিখে বিজ্ঞপ্তি দাখিল না করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বর্তমানে আসামী হৃদয় আইন থেকে বাঁচতে পলাতক থাকা সত্ত্বেও শাহানাজকে বিভিন্ন অজানা নম্বর থেকে ফোন করে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ভুক্তভোগী নারী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
যৌতুকের দানবীয় লোভ কীভাবে একটি সাজানো সংসার ধ্বংস করে দিতে পারে এবং একজন আত্মনির্ভরশীল পোশাকশ্রমিককে নিঃস্ব করে দিতে পারে, শাহনাজের ঘটনা তার এক স্পষ্ট দলিল। মাথার ওপর ছাদ ও জীবনের নিরাপত্তা হারিয়ে মানবেতর দিন কাটানো এই নারীর ন্যায়বিচারের স্বার্থে পলাতক হৃদয়ের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অত্যন্ত জরুরি।


