সোনারগাঁয়ের জ্ঞান-ঐতিহ্যের অমর আলোকবর্তিকা হযরত শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র.)

নারায়ণগঞ্জ (সোনারগাঁও) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ
সোনারগাঁয়ের জ্ঞান-ঐতিহ্যের অমর আলোকবর্তিকা হযরত শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র.)
৪৩

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রাচীন জনপদ সোনারগাঁ বহু মনীষীর পদচারণায় সমৃদ্ধ। তবে এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের শিকড় অনুসন্ধান করতে গেলে যে নামটি সর্বাগ্রে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাধক ও জ্ঞানতাপস হযরত শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র.)। ত্রয়োদশ শতকে তাঁর সোনারগাঁ আগমন বাংলার জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা বিস্তার এবং আধ্যাত্মিক ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।

 

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, হযরত শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র.) বুখারার এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই জ্ঞান অর্জনের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি পারস্যের খোরাসানে গমন করেন এবং সেখানে নিজেকে বিদ্যা ও প্রজ্ঞার অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীকালে রাজকীয় পদ-মর্যাদার প্রতি কোনো আকর্ষণ না দেখিয়ে জ্ঞান বিস্তারের মহান উদ্দেশ্যে ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করেন।

 

দিল্লিতে পৌঁছে তিনি একটি উচ্চমানের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাওহীদের বাণী প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যে তৎকালীন সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন মুগ্ধ হলেও কায়েমি স্বার্থান্বেষী একটি মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে সুলতানের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ এড়িয়ে তিনি দিল্লি ত্যাগ করেন এবং বিহারের মনহী অতিক্রম করে প্রায় ১২৭০ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁয়ের পঙ্খিরাজ খালের তীরবর্তী শান্ত পরিবেশে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন।

সোনারগাঁয়ে আগমনের পর তিনি একটি উন্নত আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যা সে সময় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করেছিল। এর পাশাপাশি তিনি একটি সুসংগঠিত খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবসেবার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। একই সঙ্গে একটি মুক্ত লঙ্গরখানারও ব্যবস্থা করেন, যেখানে অভাবী মানুষ ও পথচারীদের জন্য প্রতিদিন বিনামূল্যে খাদ্যের ব্যবস্থা ছিল।

 

জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের কল্যাণ, সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং বাংলা ও আসাম অঞ্চলে ন্যায়বিচার ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম শিক্ষা, মানবসেবা এবং আধ্যাত্মিক আদর্শের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আজও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় তিন দশক সোনারগাঁয়ে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে এই মহান সাধক ইন্তিকাল করেন। তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর প্রিয় শিষ্য হযরত শিহাবুদ্দীন ইয়াহইয়া মনরী (র.) এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকেন্দ্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার সেই ধারা অব্যাহত রাখেন।