স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে বেতার-টেলিভিশনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ শিল্পী সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে: ক্ষুব্ধ সাধারণ শিল্পীরা
কক্সবাজারের আঞ্চলিক ও লোকজ গানের পরিচিত মুখ শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের বিরুদ্ধে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদের নাম ভাঙিয়ে সরকারি বেতার ও টেলিভিশন কেন্দ্রে নগ্ন প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার এই অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং কথিত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা একপ্রকার তটস্থ ও চাপে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় শিল্পীরা। সরকারি গণমাধ্যমে এমন পেশিশক্তি ও প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টায় কক্সবাজারের সুযোগবঞ্চিত ও প্রকৃত মেধাবী সাধারণ শিল্পীদের মাঝে দিন দিন চরম ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এই শিল্পীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক ও লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য হয়েছেন।
অনুসন্ধান ও অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যমতে, সিরাজুল ইসলাম আজাদের এই প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি নতুন কিছু নয়। বিগত ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিনি চকরিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে সময়ও তিনি নিজের রাজনৈতিক পদবি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সিরাজুল ইসলাম আজাদের সেই আধিপত্য বিস্তারের পুরনো স্বভাব ও ধারাবাহিকতা বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। বরং খোলস পালটে তিনি এখন নিজেকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদের অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে সর্বত্র উপস্থাপন করছেন। এই মিথ্যা পরিচয়ের দাপট দেখিয়েই তিনি বেতার ও টেলিভিশনে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে কক্সবাজার বেতার কেন্দ্রকে ঘিরে শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিতর্ক ও ক্ষোভের কথা অকপটে জানিয়েছেন একাধিক স্থানীয় শিল্পী। তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, আঞ্চলিক ও লোকজ গানের অডিশন থেকে শুরু করে বিচারিক কার্যক্রমে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং সেখানে তিনি চরম স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নেন। এমনকি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সম্পূর্ণ অযোগ্য ও অদক্ষ প্রার্থীদের অডিশনে উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুতর ও লজ্জাজনক অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে। স্থানীয় শিল্পীদের মতে, এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে আঞ্চলিক গানের সুস্থ ধারা এবং কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংগীতের প্রকৃত মান ও যোগ্যতার পরিবর্তে যদি কেবল ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অর্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে প্রকৃত মেধাবী শিল্পীরা অচিরেই হারিয়ে যাবেন বলে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অধিকারবঞ্চিত শিল্পীরা ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, অতীতে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছেন, তারা কীভাবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে রাতারাতি নিজেদের পরিচয় পরিবর্তন করে আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন? অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগকে পুঁজি করে সিরাজুল ইসলাম আজাদকে আবারও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পুনর্বাসনের এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এমনকি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থানকে আরও পাকাপোক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের মতে, সরকারি কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এমন একক ও অনৈতিক প্রভাব কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং মেধা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতেই শিল্পী নির্বাচন নিশ্চিত করা উচিত।
ভুক্তভোগী শিল্পীদের একটাই প্রশ্ন, একজন শিল্পীর রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবের দোহাই দিয়ে সরকারি বেতার ও টেলিভিশনের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাত্যহিক কার্যক্রম কতটা কলুষিত হতে পারে? অডিশন, শিল্পী তালিকাভুক্তি এবং বিচারিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি আজ কোথায়? এ সকল গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারী শিল্পীরা অবিলম্বে কক্সবাজার বেতার কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের কাছে অডিশন প্রক্রিয়া, বিচারক নিয়োগ এবং শিল্পী তালিকাভুক্তির বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গন হলো একটি সমাজের দর্পণ। সেখানে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে যদি রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি আধিপত্য বিস্তার করে, তবে তা পুরো জাতির জন্যই চরম অশনিসংকেত। শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা এই গুরুতর অভিযোগগুলো সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। অভিযোগগুলোর একটি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে উদ্ঘাটিত হওয়া প্রয়োজন, যাতে করে সরকারি গণমাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য ও মেধাবী শিল্পীদের জন্য সমান ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

