গৌরনদীতে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত: ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দোকান পেলেন দুই অসহায় ব্যক্তি

মোঃ শরীফ সুজন, গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৯ অপরাহ্ণ
গৌরনদীতে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত: ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দোকান পেলেন দুই অসহায় ব্যক্তি
৭৫

সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় এক অনন্য ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উপজেলা ভূমি প্রশাসন। দীর্ঘদিনের অভিশপ্ত ভিক্ষাবৃত্তির জীবন পেছনে ফেলে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার এক অভাবনীয় সুযোগ পেয়েছেন উপজেলার দুই অসহায় ভিক্ষুক। তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি খাসজমির চান্দিনা ভিটিতে সম্পূর্ণ নতুন দোকানঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা ভূমি প্রশাসনের এই মহতী ও সময়োপযোগী উদ্যোগে অবহেলিত এই দুই মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার এক আলোকিত দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার পিঙ্গলাকাঠী বাজারে নবনির্মিত এই দুটি দোকানঘর আনুষ্ঠানিকভাবে সুবিধাভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জানা গেছে, গৌরনদী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেহেদী হাসানের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই দোকানঘর দুটি নির্মাণ করা হয়েছে। পুনর্বাসনের জন্য নির্বাচিত এই দুই অদম্য ব্যক্তি হলেন পিঙ্গলাকাঠী এলাকার বাসিন্দা মো. মনির সরদার এবং কুতুবপুর এলাকার মো. মজিবর সরদার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের মতামতের ভিত্তিতে এবং তাদের চরম আর্থিক অসচ্ছলতা ও অসহায়ত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে বিবেচনা করে পুনর্বাসনের জন্য তাদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়েছে।

‘ভূমি সেবার শুদ্ধতাই কমাতে পারে সামাজিক বিরোধ’—এই সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগানকে সামনে রেখেই হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পুনর্বাসনে এই প্রশংসনীয় উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অন্যের কাছে হাত পেতে জীবিকা নির্বাহ করা এই দুই ব্যক্তির সামনে এখন নিজের কায়িক শ্রমে ও সম্মানের সঙ্গে আয় করার এক দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। নবনির্মিত এই দোকানে ব্যবসা করে তারা নিজেদের ও পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ধীরে ধীরে ভিক্ষাবৃত্তির মতো অমর্যাদাকর পেশা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারবেন বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। সরকারি খাসজমির সঠিক ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই ছিল প্রশাসনের এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

দোকানঘর হস্তান্তরের এই আনন্দঘন ও আবেগপূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহিম। এছাড়াও এই মহতী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন নলচিড়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল ফকির, মো. ফুয়াত হোসেন এ্যনি, পিঙ্গলাকাঠী বাজার কমিটির সভাপতি মো. হারুন অর রশিদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। নতুন দোকানঘর হাতে পেয়ে দুই উপকারভোগীর চোখেমুখে ছিল বাঁধভাঙা আনন্দের উচ্ছ্বাস। তাদের প্রত্যাশা, নতুন এই দোকান থেকে অর্জিত আয় দিয়ে তারা নিজেদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন এবং সমাজে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসান তার বক্তব্যে জানান, শুধুমাত্র ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধের মৌখিক আহ্বান জানালেই সমাজের এই গভীর সমস্যার সমাধান হয় না; এর পাশাপাশি তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও সমানভাবে জরুরি। সেই মানবিক চিন্তা থেকেই ভিক্ষাবৃত্তি থেকে তাদের ফিরিয়ে এনে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসনের এ ধরনের পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

গৌরনদী উপজেলা ভূমি প্রশাসনের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষদেরও মর্যাদাপূর্ণ জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। খাসজমির এমন জনকল্যাণমুখী ব্যবহার সারা দেশের অন্যান্য উপজেলার জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। এই দুই ব্যক্তির স্বাবলম্বী হওয়ার সংগ্রাম সমাজের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া মানুষদেরও নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগাবে।