প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি গায়েব: পুলিশের মিথ্যাচার ফাঁস, গ্রেপ্তার ২
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা শেষে ফেরার পথে চাঞ্চল্যকরভাবে পালিয়ে যাওয়া শীর্ষ মাদক কারবারি রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’র (৩০) পলায়ন রহস্যে নতুন মোড় নিয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক দাবির বিপরীতে তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, পিচ্চি রাজা গাজীপুরের বাইমাইল বা নাওজোড় এলাকা থেকে নয়, বরং খোদ রাজধানী ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকেই প্রিজন ভ্যান থেকে সুকৌশলে পালিয়েছে। এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা এবং আসামিকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পাঁচজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ইতিমধ্যেই দুইজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পিচ্চি রাজাসহ মোট ৩০ জন হাজতি আসামিকে প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকার মেট্রোপলিটন আদালতে হাজিরার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আদালতে আইনি কার্যক্রম শেষে কড়া নিরাপত্তায় আসামিদের পুনরায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে আনার পথে এই চাঞ্চল্যকর পলায়নের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই প্রিজন ভ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করেছিলেন যে, গাজীপুরের নাওজোড় বা বাইমাইল এলাকায় পৌঁছানোর পর পিচ্চি রাজাকে শৌচকর্মের জন্য ভ্যান থেকে নিচে নামানো হয়েছিল এবং ঠিক সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বাকি ২৯ জন আসামিকে নিরাপদে কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে পুলিশের এই বানোয়াট দাবির পর গঠিত তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ কমিটির নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে আসল সত্য। জিজ্ঞাসাবাদে পাহারার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যে পদে পদে মারাত্মক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। আসামি ঠিক কোন স্থান থেকে পালিয়েছে, সে বিষয়েও তারা বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী ও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রদান করেন। তদন্তের একপর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ও সার্বিক বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গাজীপুরে প্রবেশের অনেক আগেই ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকেই পিচ্চি রাজা প্রিজন ভ্যান থেকে উধাও হয়ে যায়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুজন পুলিশ সদস্য হলেন প্রিজন ভ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা উপ-পরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার এবং চালক নায়েক কামাল হোসেন।
এই পুরো ঘটনার সার্বিক দিক নিয়ে কথা বলেছেন পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান ও গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (সিটি এসবি) মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম। তিনি জানান, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তারা এখনও প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা করছেন এবং সঠিক তথ্য দিচ্ছেন না। যে স্থান থেকে আসামি পালানোর কথা তারা প্রাথমিকভাবে উল্লেখ করেছিলেন, তদন্তে সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ ও বিস্তারিত তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করে তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও পলাতক পিচ্চি রাজাকে এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনার পর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এর জেলার জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছিলেন, পিচ্চি রাজাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুনরায় গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী, পিচ্চি রাজা রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একজন শীর্ষ ও চিহ্নিত মাদক কারবারি। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানাসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র রাখা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রায় ২৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া প্রহরার মধ্যে একটি সুরক্ষিত প্রিজন ভ্যান থেকে শীর্ষ একজন অপরাধীর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আসামির পলায়নের চেয়েও পাহারার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের মিথ্যাচার ও দায়িত্বে চরম অবহেলা বেশি হতাশাজনক। এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পলাতক পিচ্চি রাজাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।










