ধান-পাটের জমিতে মিষ্টি আখ, স্বাবলম্বী হচ্ছেন সাটুরিয়ার চাষিরা

সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
ধান-পাটের জমিতে মিষ্টি আখ, স্বাবলম্বী হচ্ছেন সাটুরিয়ার চাষিরা
৯০

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আখ চাষ। অল্প খরচে ভালো লাভ পাওয়ায় উপজেলার সাতটি ইউনিয়নেই বাড়ছে আখ চাষের পরিধি। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

বিশেষ করে উপজেলার সদর ইউনিয়ন, দরগ্রাম ইউনিয়ন, তিল্লি ইউনিয়ন ও দিঘলীয়া ইউনিয়নে দিন দিন বাড়ছে আখ চাষির সংখ্যা। এসব এলাকায় চাষ হওয়া আধুনিক জাতের আখের মধ্যে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় গেন্ডারী ও রং বিলাস জাত উল্লেখযোগ্য। এসব জাত সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

 

ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় সাটুরিয়ায় উৎপাদিত অধিকাংশ আখ রাজধানীসহ আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকরাও ভালো দাম পাচ্ছেন।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, একসময় যেসব জমিতে নিয়মিত ধান ও পাটের চাষ হতো, সেসব জমিতে এখন আখের বাম্পার ফলন কৃষকদের আগ্রহী করে তুলেছে। উপজেলার বিভিন্ন মাঠ এখন সারি সারি মিষ্টি আখে ভরে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং রোগবালাই কম হওয়ায় কৃষকদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।

 

সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক মিয়া জানান, এবারই প্রথম ৩৫ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছেন তিনি। এতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। আবহাওয়া ভালো থাকলে ওই জমির আখ প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

 

বরাঈদ ইউনিয়নের সোনাকান্দা-মহেরা গ্রামের আখ চাষি লালু (লালন) মিয়া জানান, তিনি একজন জাতকৃষক এবং দীর্ঘদিন ধরে আখ চাষ করে আসছেন। এবার তিনি তিন বিঘা জমিতে আখ চাষ করেছেন। এতে প্রায় এক লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। আশা করছেন, এবার ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার আখ বিক্রি করতে পারবেন।

 

আখ চাষ সম্পর্কে লালন মিয়া বলেন, সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে অন্যান্য ফসলের তুলনায় আখ চাষে দ্বিগুণ লাভ পাওয়া যায়। উত্তম পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত গভীর দোআঁশ মাটি আখ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মাটির পিএইচ মাত্রা ৬ দশমিক ৫ হলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। আখের ভালো বৃদ্ধির জন্য ২৫ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়।

 

তিনি জানান, সাধারণত আশ্বিন থেকে কার্তিক মাস (অক্টোবর-নভেম্বর) কিংবা অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) আখ রোপণের উপযুক্ত সময়। ভালো ফলনের জন্য প্রতি বিঘা বা হেক্টরে সুষম মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জৈব সার প্রয়োগ করতে হয়। চারা গজানোর ১২০ থেকে ১৫০ দিন পর বাকি ইউরিয়া ও এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

 

তিনি আরও বলেন, খরা মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিতে হবে এবং বর্ষায় জমিতে পানি জমে না থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগাক্রান্ত গাছ বা অংশ কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং অনুমোদিত রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে।

 

একই ইউনিয়নের খৈলশাটুরা গ্রামের আখ চাষি মহুর মিয়া বলেন, ধলেশ্বরী নদীঘেঁষা চরাঞ্চলের অনেক কৃষক এখন আখ চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। পরিশ্রম ও ব্যয় বেশি হলেও আখ চাষে অনেকেই সফল হয়েছেন। একসময় অনাহারে থাকা কৃষকরা এখন আখ চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

 

উপজেলার তিল্লি ইউনিয়নেও আখ চাষের ব্যাপকতা দেখা গেছে। ওই ইউনিয়নের কৃষক সলিমুদ্দিন জানান, তাঁদের ইউনিয়ন মূলত সবজি চাষের জন্য পরিচিত। তবে এবার শখ করে ২৫ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছেন তিনি। এতে তাঁর খরচ হয়েছে ২২ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে পাইকার ৮০ হাজার টাকা দাম প্রস্তাব করেছেন। তবে তিনি বিক্রি করেননি। আশা করছেন, মাস শেষে প্রায় এক লাখ টাকায় আখ বিক্রি করতে পারবেন।

 

সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাচ্ছুম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১৫ হেক্টর জমির আখ কাটা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে আখ চাষিদের জন্য সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তবে মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের আধুনিক জাতের আখ চাষ ও জৈব সার ব্যবহারে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

 

তিনি আরও বলেন, কৃষকরা যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান এবং আখ চাষ আরও সম্প্রসারিত হয়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।