মাছ উৎপাদনে রাজশাহী বিভাগে শীর্ষে নাটোর, তবু গরিবের পাতে মাছের সংকট
মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ নাটোর মাছ চাষে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাণিজ্যের পাশাপাশি জেলার মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ খাত। তবে মাছ উৎপাদনে রাজশাহী বিভাগের শীর্ষ জেলা হওয়ার পরও বাড়তি উৎপাদনের সুফল সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের পাতে কতটা পৌঁছাচ্ছে—সে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
নাটোরে চলনবিল, হালতিবিলসহ প্রায় ৮ হাজার ৪৮০ হেক্টর আয়তনের ৩১ হাজার ৩২০টি পুকুর ও জলাশয়ে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ, সিলভার কার্প, মিরর কার্প, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, শিং, কৈ, পাবদা ও টেংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বছরে প্রায় ৭৯ হাজার ৬৯৭ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এর বিপরীতে স্থানীয় চাহিদা প্রায় ৩৪ থেকে ৩৯ হাজার মেট্রিক টন।
বর্ষা মৌসুমে নাটোরের সিংড়ার চলনবিল ও নলডাঙ্গার হালতিবিল মাছের অন্যতম বড় আধারে পরিণত হয়। প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর প্লাবনভূমি বা ফ্লাডপ্লেইন থেকে প্রাকৃতিক ও মৌসুমি মাছ উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
বর্ষায় নাটোরের বিভিন্ন বিলের প্রায় ১৪ হাজার ৪৯২ হেক্টর এলাকায় উৎপাদিত মাছের একটি অংশ শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এভাবে প্রায় ৪ হাজার ৭৭ মেট্রিক টন মাছ থেকে শুঁটকি উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়।
নাটোরের মাছচাষিরা পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে জীবন্ত মাছ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করেন। প্রতিদিন এ পদ্ধতিতে দুই শতাধিক মিনি ট্রাকে করে মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়। মাছ চাষ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে জেলায় প্রায় ৪৯ হাজার ৪০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ৯টি মৎস্য অভয়াশ্রম। মাছ উৎপাদন ও বাণিজ্য ঘিরে জেলায় বছরে দুইশ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হচ্ছে।
এমন সাফল্যের মধ্যেই ‘রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধন করা হয়েছে। নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
তবে মৎস্য উৎপাদনের এই বিপুল সাফল্যের বিপরীতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতার চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। স্থানীয় নিম্নআয়ের মানুষের অভিযোগ, মাছের উৎপাদন বাড়লেও বাজারে মাছের দাম কমেনি। বরং অনেক দরিদ্র পরিবারের জন্য নিয়মিত মাছ কেনা এখনো বিলাসিতার মতোই রয়ে গেছে।
গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৮৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ সপ্তাহে দুই দিন মাছ কিনে খেতে পারেন। অনেকে ১৫ দিনে একবার মাছ কেনেন। আবার এমন নিম্নআয়ের পরিবারও রয়েছে, যারা অর্থাভাবে নিয়মিত মাছ কিনতেই পারেন না।
একজন দিনমজুর বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এত মাছ হয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায়। কিন্তু বাজারে গিয়ে মাছ কিনতে গেলে দাম দেখে ফিরে আসতে হয়। মাসে কয়েকবার মাছ খেতে পারাটাই আমাদের কাছে বড় ব্যাপার।’
মৎস্য উৎপাদনে নাটোরের সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের। তবে উৎপাদন, বিপণন ও রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি। কারণ মাছ শুধু বাণিজ্যের একটি পণ্য নয়, এটি মানুষের পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস।
মাছ উৎপাদনে নাটোরের ধারাবাহিক অগ্রগতি আনন্দের খবর হলেও যে জেলার বিল-পুকুরে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হয়, সেই জেলার দরিদ্র মানুষের পাতে যদি নিয়মিত মাছ না ওঠে, তাহলে সেই সাফল্যের হিসাব অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাছের দাম নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদনের সাফল্য তখনই সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণে রূপ নেবে, যখন নাটোরের মাছ শুধু দেশের বিভিন্ন বাজারেই নয়, নাটোরের গরিব মানুষের থালাতেও নিয়মিত পৌঁছাবে।

