রাঙ্গামাটিতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত: শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দ্রুত রোডম্যাপের দাবি
নানা বর্ণাঢ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পাহাড়ের প্রাণকেন্দ্র রাঙ্গামাটিতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে গত রবিবার (৯ আগস্ট ২০২৬) সকালে রাঙ্গামাটি পৌরসভা চত্বরে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রথাগত দলীয় নৃত্য ও এক বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। পৌরসভা প্রাঙ্গণের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেখান থেকে এক সুসজ্জিত বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়ে পাহাড়ি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনসমষ্টির অধিকার সুনিশ্চিত করা, ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য অনতিবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার জোরালো দাবি জানান। সভায় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল শাখার সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শিশির চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট চঞ্চু চাকমা, ফদাং তাং রান্দাল এবং সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদারসহ বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে নেতৃবৃন্দ তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে তারা রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি চান। একই সাথে তারা জাতিসংঘ ঘোষিত অধিকার বাস্তবায়ন এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তির শতভাগ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে আশু ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণার জন্য তাগিদ দেন। বক্তারা আরও ব্যক্ত করেন যে, কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় অন্য কোনো পক্ষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় হতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে তারা রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে নিজেদের স্বকীয় পরিচয়ের স্বীকৃতি পাওয়ার যে দাবি জানিয়ে আসছেন, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো কার্যকর বা সদর্থক উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের মেহনতি মানুষের মৌলিক সুবিধা ও মৌলিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল, তার অবাস্তবায়িত ধারাগুলো দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের সভাপতি ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ শিশির চাকমা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে ভুল রাজনীতি পরিচালনা করে আসছে। পাহাড়ি এলাকার মানুষের ন্যায্য ও যৌক্তিক জনদাবিগুলোকে এখন সময় এসেছে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার। তিনি আরও ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন, প্রায় তিন দশক আগে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি এবং সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান আন্তরিকতার অভাব দেখা যাচ্ছে। বিষয়টিকে দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার এই নীতি অনন্তকাল চলতে পারে না বলে তিনি সতর্ক বার্তা দেন।
গম্ভীর আলোচনা পর্বের পরপরই রাঙ্গামাটি পৌরসভা চত্বর থেকে বের হওয়া বর্ণাঢ্য আনন্দ র্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ প্রদক্ষিণ করে। নিজ নিজ প্রথাগত পোশাক ও সাজসজ্জায় সজ্জিত হয়ে বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর হাজারো নারী-পুরুষ, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই র্যালিতে অংশ নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। সমাবেশ থেকে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধানের জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়।
রাঙ্গামাটিতে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার ও মৌলিক প্রত্যাশার কথা পুনর্ব্যক্ত করে। পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

