লেবুচাষে ভাগ্য ফিরছে সাটুরিয়ার কৃষকদের !
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় লেবু চাষে ভাগ্য ফিরেছে অনেক কৃষকের। অধিক লাভজনক হওয়ায় এখনকার কৃষকরা ধান, পাট চাষের পরিবর্তে এখন লেবুচাষের দিকেই বেশী ঝুকে পড়ছে। অত্র উপজেলার গাজীখালী ও ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী দোয়াঁশ- পলি মাটিতে ব্যাপক লেবুর আবাদ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ, দিঘলীয়া, দরগ্রাম তিল্লি, সাটুরিয়া সদর ইউনিয়নে বিঘার পর বিঘা- লেবুর বাগানের মনোরম দৃশ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সরজমিনে দেখাগেছে, এই সব এলাকায়, বষা মৌসুমেও কৃষকরা লেবু বাগানের আগাছা পরিস্কারে ব্যস্ত সময় পার করছে। কেউ কেউ লেবুগাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন। কেউ গাছের পোকা নিধনের জন্য কীটনাষক স্প্রে করছেন আবার কেউ খেতে সার ছিটাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে দিঘলীয়া ইউনিয়নের চাচিতারা গ্রামের লেবুচাষী ওয়াজেদ মিয়া জানান, আমি প্রায় দশ বিঘা জমিতে লেবু চাষ করে থাকি। বছর শেষে সার্বিক খরচ বাদে আমার প্রায় দশ লক্ষ টাকা নীট মুনাফা হয়। আগে আমি কাচাঁমালের ব্যবসা করতাম। এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে পেপেঁ, কাচঁকলা, জাম্বুরা, ও বিভিন্ন প্রকার তরি-তরকারী কিনে ঢাকার কাওরান বাজার-শ্যাম বাজারে বিক্রি করতাম। সেই সময় আমার এলাকা থেকে আমি একচাটিয়া এই তরি-তরকারীর ব্যবসায় করে বেশ টাকা রোজগার করেছিলাম। কিন্তু পরে আমাকে দেখে অনেকেই এই ব্যবসায় নেমে পড়ে। আস্তে আস্তে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে এবং লাভের অংক কমতে শুরু করলে আমি আমার এক শুভাকাঙ্কীর কথা মত লেবুর ব্যবসা/চাষ আরম্ভ করি।
প্রথমে আমি আমার এলাকার ধলেশ্বরী নদীর চরাঞ্চলে কিছু জমি কম দামে লীজ নিয়ে লেবুর চারা লাগাই। দেড় বছরের মাথায় চারাগুলো ফলন দিতে শুরু করে। ঐ বছরই আমার ৪০শতাংশ জমি থেকে খরচ বাদে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা আয় করি। । ক্রমে ক্রমেই আমি লীজের জমির পরিমান বাড়াতে থাকি এবং আশানুরোপ ফল পেতে থাকি। বর্তমানে আমি দশ বিঘা জমিতে লেবুর চাষ করছি। সার্বিক খরচ বাদে আমার বছরে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা আয় হয়। এখন মার্শাল্লাহ ভালো আছি।
লেবুচাষের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, জাত চিনে লেবুর চাষ করতে হয়। আমাদের দেশে বাউ লেবু-২, পাতি লেবু, চায়না লেবু, বারী-১, বারী-২, বারী-৩. কাগজী লেবু, সিডলেসসহ বিভিন্ন জাতের লেবুর চাষ হয়ে থাকে। তার মধ্যে বারী এবং সিডলেস জাতিয় লেবুর চাষ উত্তম। কারণ এই জাতিয় লেবু আকারে যেমন বড় ঠিক তেমনি সুগন্ধিযুক্ত হয়ে থাকে। তাছাড়া এই লেবুর অন্যমত বৈশিষ্ট হলো এতে কোন বিজি থাকেনা এবং খেতে অত্যন্ত সুস্বাধু হয়ে থাকে।
লেবুগাছের পরিচর্চা সম্পর্কে তিনি জানান, লেবু গাছ সবল ও সুস্থ্য থাকলে গাছে অধিক ফলন ধরে। তাই গাছ সুস্থ্য রাখতে পর্যাপ্ত পরিচর্চা আবশ্যক। যেমন গাছের নিচের আগাছা পরিস্কার, বিভিন্ন প্রকার রোগে প্রয়োজনীয় কীটনাষক স্প্রে করা, শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেওয়া এবং গাছ ছেটেঁ রাখা ইত্যাদি।
একই কথা জানান, বরাইদ ইউনিয়নের কালাম মিয়া। তিনি বলেন, আমি আগে মানুষের বাড়ীতে কামলা দিতাম। সখের বসে বাড়ীর উঠানে ১০টি লেবুর চারা লাগিয়ে ছিলাম। তাতেই আমার প্রতিদিনের বাজার খরচ চলে যেত। এতে আমি উৎসাহী হয়ে জনৈক গিরস্থের বাড়ীতে কামলা দিতে গিয়ে ছলকরে তার ফেলে রাখা ৩০শতাংশ জমি সামান্য অর্থের বিনিময়ে পাচঁবছরের জন্য লীজ নিয়ে লেবুর চারা লাগাই। তাতেই বাজিমাৎ । দুই বছর পরে উক্ত জমি থেকে আমার ৭ লক্ষ টাকা আয় হয়। ক্রমে ক্রমেই আমি জমির পরিমান বাড়াতে থাকি। এখন আমি তিনবিঘা জমিতে লেবুর আবাদ করছি। লাভও পাচ্ছি বেশ। এখন আমাকে আর মানুষের বাড়ীতে কামলা খাটতে হয় না। লেবু ক্ষেতের টাকা দিয়েই সংসারের যাবতীয় খরচসহ ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি। বলতে পারেন লেবুচাষ আমার ভাগ্য পরিবর্তন করে দিয়েছে।
তিল্লি ইউনিয়নের সুবিদারী জানান, আমি আগে তামাকের চাষ করতাম। তামাক চাষ লাভজনক হলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ছিল। বিশেষ করে খরচের ব্যপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তারপর সারা দিন খাটা-খাটি করে হাত-পায়ে লাগা তামাকের বিষাক্ত গন্ধের কারণে ঠিকমত পেটপুরে ভাত খেতে পারতাম না। পরে চিন্তা করে, সিডলেস জাতীয় লেবুচাষ আরম্ভ করি। এখন বেশ ভাল আছি। অর্থ উর্পাজনের সাথে ভারতি লেবুর সুভাষ নিয়ে এখন পেটভরে অন্তত ভাত খেতে পারছি।
তিনি আরো জানান, আমরা সাধারনত স্থানীয় বাজারে আমাদের উৎপাদিত লেবু বিক্রি করে থাকি। বড়জোড় ঢাকাতে যাই। দেশসহ আন্তজার্তিক বাজারেও আমাদের লেবুর চাহিদা রয়েছে। যদি আমরা সরকারী পুষ্ঠপেষকতায় দেশের বাহিরে লেবু বিক্রি করতে পারতাম তাহলে আমাদের অধিকলাভ ও দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন সম্ভব হতো। এই ব্যাপারে আমরা সরকারের কৃপা-দৃষ্টি আকর্ষন করেন।
সাটুরিয়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাচ্ছুম জানান, সাটুরিয়া উপজেলার লেবু চাষের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। উপজেলায় প্রতিবছর ব্যাপক ভাবে লেবু চাষ হয়ে থাকে। গত বছর এখানে ১১৩ হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ হয়েছিল। এবার আশা করছি ১২০ হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ হবে । আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লেবুচাসীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। কৃষকদের অধিক ও ভালমানের লেবু ফলনে উপজেলা কৃষি অফিস সর্বাত্বক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, সাটুরিয়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের সব কটিতেই এখন কম-বেশী লেবুচাষ হচ্ছে। বিশেষ করে ধলেশ্বরী ও গাজী খালী নদীর তীরবর্তী এলাকা গুলোতে প্রচুর পরিমান লেবুচাষ হচ্ছে। এখানকার লেবুর একটা আলাদা বৈশিষ্ট হলো-এই লেবুতে কোন বিচি নেই ও খেতে সুস্বাধু ও সুগন্ধিময়। স্থানীয় চাষীদের ইচ্ছা সরকারী সহযোগিতা পেলে তারা দেশে বাহিরে লেবু রফতানী করবে।

