গাজা/ফিলিস্তিন
যুদ্ধবিরতির আড়ালে রক্তপাত, ধ্বংসস্তূপে এক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ
গাজায় যুদ্ধের বিভীষিকা কেবল বোমার গর্জনে কিংবা ধসে পড়া অট্টালিকায় সীমাবদ্ধ নেই; থমকে যাওয়া জীবনের প্রতিটা নিঃশ্বাসে এখন সেখানকার মানুষদের এর চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে। এক অবরুদ্ধ উপত্যকায় দাঁড়িয়ে একদিকে ক্রমাগত রক্তপাত ও স্বজন হারানোর স্তব্ধতা, অন্যদিকে শিশুদের হাত থেকে খাতা-কলম ছিনিয়ে নেওয়া আর জীবনের ন্যূনতম রসদের জন্য হাহাকার—সব মিলিয়ে গাজাবাসীর অস্তিত্ব আজ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে।

কাগজের যুদ্ধবিরতি :
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর বিশ্বমঞ্চে যখন কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, তখন হয়তো দূরের মানুষেরা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। কিন্তু গাজার মাটিতে সেই রক্তপাত কখনো থামেনি। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থা ওসিএইচএ (OCHA)-এর পরিসংখ্যান বলছে, কথিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত গাজায় নতুন করে অন্তত ৮৫৬ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ২,৪৬৩ জন। এমনকি নাম-পরিচয়হীন আরও ১০৩টি মরদেহ পরবর্তীতে শনাক্ত করে এই তালিকায় যুক্ত করতে হয়েছে।
অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতির আড়ালেও হামলা, গোলাবর্ষণ আর স্নাইপারের বুলেট থামেনি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞে এ পর্যন্ত বাহাত্তর হাজারের বেশি অমূল্য প্রাণ ঝরে গেছে, আর পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আঘাত নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ।

অন্ধকারে এক পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ :
একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য কেবল বোমাই যথেষ্ট নয়, তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুছে দেওয়াই যথেষ্ট—গাজায় আজ সেটাই ঘটছে। ওসিএইচএ-এর তথ্যানুযায়ী, সংঘাতের কারণে গাজার শিক্ষা অবকাঠামো আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপ। বর্তমানে অন্তত ৬,৩৭,৪৭৫ জন স্কুলগামী শিশু নিয়মিত শিক্ষার আলো থেকে একেবারে বঞ্চিত।
পুরো গাজাজুড়ে থাকা ৮১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৫.৫ শতাংশই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধুলোয় মিশে গেছে। যেসব শ্রেণিকক্ষে একসময় শিশুদের কোলাহল আর সম্ভাবনার স্বপ্ন ধ্বনিত হতো, তা এখন বাস্তুচ্যুত গৃহহীন মানুষের অস্থায়ী আশ্রয় কিংবা লাশের স্তূপ। বোমার আঘাত কেবল দেয়াল ভাঙেনি, ভাঙছে একটি পুরো প্রজন্মের মেরুদণ্ড। খাতার পাতা ঢেকে গেছে বারুদের পোড়া গন্ধে।

জীবনধারণের নির্মম দাম :
মৃত্যুর এই উপত্যকায় এখন ‘বেঁচে থাকা’ শব্দটাই সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের জীবনকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে লাইটারের স্বাভাবিক বাজারমূল্য ছিল মাত্র ১০ টাকা, চরম সংকটের সুযোগে তা এখন বিক্রি হচ্ছে অবিশ্বাস্য ৫ হাজার টাকায়! তীব্র খরা আর তাপদাহের মধ্যে একটু বাতাসের খোঁজে একটি সাধারণ ফ্যান কিনতে মানুষকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
খোলা আকাশের নিচে একমুঠো অন্ন বা একটু বিশুদ্ধ পানির জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে চলা মানুষগুলোর কাছে টাকার অংক এখন শুধুই উপহাস। জীবনের চরম সংকটে পড়ে মানুষ আজ বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদটুকুও সংগ্রহ করতে পারছে না।

অনিশ্চয়তার মহাসমুদ্রে এক নিঃসঙ্গ উপত্যকা :
একদিকে চোখের সামনে প্রিয়জনের নিথর দেহ, অন্যদিকে ক্ষুধায় ছটফট করা সন্তানের আর্তনাদ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট ফিলিস্তিনিদের দিন কাটছে এক গভীর অনিশ্চয়তায়। গাজার এই সংকট কেবল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত নয়, এটি মানবতার আত্মাকে প্রতিদিন হত্যা করার এক নির্মম প্রক্রিয়া। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি এখনই কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে মানচিত্র থেকে শুধু গাজার শিশুদের ভবিষ্যৎই মুছে যাবে না, বরং বিশ্ব বিবেকের গায়েও লেগে থাকবে এক মোচনহীন কলঙ্ক।

