কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি স্থানীয়দের

সাভারে অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি অবৈধ সীসা উৎপাদন কারখানা

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : প্রকাশিত: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:১০ অপরাহ্ণ
সাভারে অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি অবৈধ সীসা উৎপাদন কারখানা
৭২

ঢাকার সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি পরিবেশবিধ্বংসী অবৈধ সীসা উৎপাদন। উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের আওয়াল মার্কেট এলাকায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এ কারণে কয়েক হাজার বাসিন্দা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এবং মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি অবৈধ কারখানার ছয়টি চুলা গুঁড়িয়ে দেয়। তবে অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই সংশ্লিষ্টরা নতুন করে আরও ছয়টি চুলা নির্মাণ করে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমানে ছয়টি অবৈধ কারখানায় মোট ১২টি চুলার মাধ্যমে আগের মতোই সীসা উৎপাদন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অবৈধ কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শরীয়তপুর জেলার নাসির মীর ও সাজু মিয়া এবং গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মো. মানিক সরকার, মো. মহসিন ও রতন নামের কয়েকজন ব্যক্তি এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত পুরাতন ব্যাটারির প্লেট কাঠ ও কয়লার আগুনে গলিয়ে সীসা উৎপাদন করা হয়। এ সময় প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র অ্যাসিডের গন্ধ, ঘন কালো ধোঁয়া এবং বিষাক্ত বায়ু ছড়িয়ে পড়ে।

 

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাস থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে চোখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, গলা জ্বালা, মাথাব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিবেশে বসবাসের কারণে এলাকায় ফুসফুসের রোগ, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

 

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা পরিবেশে ব্যাটারির প্লেট পোড়ানোর সময় নির্গত সীসাযুক্ত ধোঁয়া ও অতিক্ষুদ্র কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি, যকৃত ও ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের মেধা ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

পরিবেশবিদদের মতে, এসব কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য শুধু মানুষের জন্য নয়, আশপাশের কৃষিজমি, ফলজ ও বনজ গাছপালা, গবাদিপশু এবং জলাশয়ের জীববৈচিত্র্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। মাটিতে সীসার উপস্থিতি খাদ্যশৃঙ্খলকে দূষিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রশাসনের সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান কার্যকর না হওয়ায় অবৈধ কারখানাগুলো বারবার চালু হয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় আংশিক উচ্ছেদ নয়, বরং একই বাউন্ডারির ভেতরে পরিচালিত সব অবৈধ কারখানা স্থায়ীভাবে সিলগালা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কীভাবে এ কার্যক্রম চলতে পারছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

এলাকাবাসী ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তর এবং সাভার উপজেলা প্রশাসনের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।