প্রকৃতির মহাতাণ্ডব

এল নিনোর হানা এবং ইউরোপের মৃত্যুমিছিল

বিশেষ প্রতিবেদন | হাফিজ আল মিথুন : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৪:০৪ পূর্বাহ্ণ
এল নিনোর হানা এবং ইউরোপের মৃত্যুমিছিল
৭৯

প্রকৃতির এক নির্মম রূপের সাক্ষী হলো বিশ্ব। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ইউরোপের শান্ত ও সুসংগঠিত জনপদে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে প্রকৃতি যেন তার চেনা রূপ বদলে এক ভয়াল সংহারকের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র হিসেবে পরিচিত ‘এল নিনো’ এবার দক্ষিণ ইউরোপের দেশ পর্তুগাল, স্পেন ও ইতালির জন্য এক ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। তীব্র দাবদাহ ও তার বহুমাত্রিক প্রভাবে ইতোমধ্যে এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সভ্যতার আত্মবিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে প্রকৃতি যেন আবারও জানিয়ে দিল, তার শক্তির কাছে মানুষ এখনও অসহায়।

 

সাধারণত শীতল বা নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার জন্য পরিচিত ইউরোপের এই অঞ্চলগুলোতে এবার তাপমাত্রা অতীতের প্রায় সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। কোথাও কোথাও পারদ ৪২ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও ওপরে ওঠায় জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই তীব্র তাপপ্রবাহ কেবল গরম আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি রূপ নিয়েছে এক নীরব প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে। হিট স্ট্রোক ও তীব্র পানিশূন্যতায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন প্রবীণ, শিশু এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগতে থাকা মানুষ। শীতপ্রধান আবহাওয়ার কথা বিবেচনায় রেখে নির্মিত অধিকাংশ ভবন বাইরের ঠান্ডা প্রতিরোধ করে ভেতরের উষ্ণতা ধরে রাখার উপযোগী হওয়ায় চরম গরমে সেগুলোই অনেক ক্ষেত্রে উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় অসংখ্য মানুষ নিজ ঘরেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমনকি প্রাণও হারিয়েছেন। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাও চরম সংকটে পড়েছে।

 

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ সমুদ্রস্রোত, যা আবহাওয়াবিজ্ঞানে ‘এল নিনো’ নামে পরিচিত। গত বছর থেকে শুরু হওয়া এই শক্তিশালী জলবায়ু চক্র ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে আরও তীব্র প্রভাব বিস্তার করেছে। বিজ্ঞানীরা একে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির স্বাভাবিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, এর পেছনে দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণ, শিল্পায়ন এবং পরিবেশের ওপর মানুষের ক্রমাগত চাপ পৃথিবীর জলবায়ুকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।

 

দাবদাহের পাশাপাশি পর্তুগাল ও স্পেনের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়া ও তীব্র গরমের কারণে সামান্য আগুনও মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে রূপ নিয়েছে। এতে হাজার হাজার একর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়েছে জীববৈচিত্র্য, আর অসংখ্য মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাতাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ধোঁয়া, পোড়া গন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করলেও প্রকৃতির এই ভয়ংকর রূপের সামনে আধুনিক প্রযুক্তি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও অনেক ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়েছে।

 

এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অপূরণীয় শোক এবং হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য স্বপ্ন। ইউরোপের এই মানবিক বিপর্যয় আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখনই মানুষ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করেছে কিংবা পরিবেশকে অবহেলা করেছে, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এল নিনোর এই ভয়াবহ প্রভাব যেন ক্ষতবিক্ষত পৃথিবীর এক নীরব সতর্কবার্তা। টিকে থাকার স্বার্থেই এখন পরিবেশ সংরক্ষণ, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিকল্প নেই। অন্যথায় আজ যে বিপর্যয় ইউরোপকে নাড়িয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে তা আরও বিস্তৃত পরিসরে সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।