শিক্ষিত সমাজের অদৃশ্য সংকট : বৃদ্ধাশ্রমে বেড়ে চলা ভিড়

হাফিজ আল মিথুন প্রকাশিত: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ৭:৪৫ অপরাহ্ণ
শিক্ষিত সমাজের অদৃশ্য সংকট : বৃদ্ধাশ্রমে বেড়ে চলা ভিড়
৮১

একসময় বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে একটি কথা প্রবাদের মতো প্রচলিত ছিল—“সন্তানই বৃদ্ধ বয়সের শেষ ভরসা”। কিন্তু সময়ের আবর্তে আজ এক নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমগুলোর দিকে তাকালে আজ আর শুধু অবহেলিত বা নিস্ব মানুষের মুখ দেখা যায় না; সেখানে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের বাবা-মায়ের তালিকা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের বাসিন্দা হওয়া এই প্রবীণদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, কেউ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ নামী চিকিৎসক, কেউ গবেষক, আবার কেউবা বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানের জনক-জননী। যে বাবা-মা নিজের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে, সব সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে ‘মানুষের মতো মানুষ’ করার চেষ্টা করেছিলেন, জীবনের শেষ বিকেলে এসে আজ তাঁদেরই ঠিকানা হচ্ছে একাকীত্বের বৃদ্ধাশ্রম।

​প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজে এই শিক্ষিত ও সচ্ছল শ্রেণির মধ্যেই প্রবীণদের দূরে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা কেন বাড়ছে? সমাজবিজ্ঞানীরা এর পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। অনেক উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য কোটি টাকা ব্যয় করেন, কিন্তু পড়াশোনা শেষে সেই সন্তানরা উন্নত দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে ভৌগোলিক দূরত্ব একপর্যায়ে মানসিক দূরত্বে রূপ নেয়। ফলে দেশে থাকা বৃদ্ধ মা-বাবা চরম একাকী হয়ে পড়েন। আসলে বর্তমান যুগে আমরা সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার বা করপোরেট সফল ব্যক্তিত্ব বানাতে যতটা মরিয়া, তাকে একজন ভালো ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ততটা আগ্রহী নই। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা মুখস্থ ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের চরিত্র বদলাতে পারে না, যদি না পরিবারে শুদ্ধাচার, কৃতজ্ঞতা ও নৈতিকতার নিয়মিত অনুশীলন থাকে। আধুনিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী হওয়ায় তীব্র কর্মব্যস্ততার অজুহাতে অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ বাবা-মাকে সময় দেওয়াকে অনেকে কঠিন মনে করেন। অনেকে অবচেতনভাবেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের লেনদেনের মানসিকতা পোষণ করেন এবং ভাবেন যে তারা নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, বাবা-মা তো শুধু তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই অহংকার ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ পরিবারকে আজ সংকুচিত করে ফেলেছে।

​এখানে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় যে, গ্রামীণ বা দরিদ্র পরিবারে বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার হার তুলনামূলক অনেক কম। এর বড় কারণ গ্রামীণ সমাজে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন এখনো অনেক শক্তিশালী এবং দরিদ্র পরিবারে সন্তানরা অভাবের সংসার হলেও বাবা-মায়ের সঙ্গেই বসবাস করেন। তাছাড়া দরিদ্র সন্তানদের বৃদ্ধাশ্রমের খরচ বহনের সামর্থ্য থাকে না। অন্যদিকে, শিক্ষিত ও সচ্ছল সন্তানেরা বৃদ্ধাশ্রমকে বাবা-মা থেকে দূরে থাকার একটি সুবিধাজনক ও বৈধ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করছেন।

​এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অসহায় বাবা-মায়েদেরও নিজেদের সুরক্ষায় কিছু বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। জীবিতাবস্থায় নিজের শেষ সম্বল বা সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে সন্তানের নামে লিখে দেওয়ার আগে গভীরভাবে ভাবা উচিত এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশে প্রচলিত “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩” অনুযায়ী আইনি সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা ও বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা দরকার, যাতে একাকীত্ব গ্রাস করতে না পারে এবং আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়।

​এই অদৃশ্য সামাজিক ব্যাধি দূর করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। প্রতিটি জেলায় আধুনিক ও মানসম্মত প্রবীণ সেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা, হোম কেয়ার সিস্টেম চালু করা, প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যবীমা ও জরুরি হেল্পলাইন চালু করা এখন অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা এবং গণমাধ্যমে প্রবীণদের বাস্তব গল্প তুলে ধরে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদেরও উচিত আশপাশের একাকী প্রবীণদের খোঁজ নেওয়া এবং সন্তানদের সামনে বাবা-মাকে সম্মান করার সংস্কৃতি তৈরি করা।

​যে শিশুটি একদিন বাবার আঙুল ধরে প্রথম হাঁটতে শিখেছিল, জীবনের কোনো এক বাঁকে এসে সেই বাবারও কিন্তু একটি লাঠির প্রয়োজন হয়। সব বৃদ্ধাশ্রম হয়তো দুঃখের প্রতীক নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয় সেবার জায়গাও হতে পারে, তবে তা যেন কখনো সন্তানের উদাসীনতা ও অবহেলার আশ্রয়স্থল না হয়। তাই আসুন, আমরা আমাদের সন্তানকে শুধু সফল নয়, বরং একজন শুদ্ধাচারী, কৃতজ্ঞ এবং মানবিক গুণসম্পন্ন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি।