ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা

লামায় ১,৩২৫ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবাসন সংকট

চৌধুরী মোহাম্মদ সুজন, স্টাফ রিপোর্টার : প্রকাশিত: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ২:০১ পূর্বাহ্ণ
লামায় ১,৩২৫ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবাসন সংকট
৬৪

পাহাড়, নদী ও সবুজে ঘেরা বান্দরবানের লামা উপজেলা উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে এই দুর্গম পাহাড়ি জনপদে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র আবাসন সংকটে ভুগছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন সুবিধার অভাব শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরকারি সেবার মানের ওপরও।

 

বর্তমানে লামা উপজেলায় কর্মরত ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কোনো সরকারি ডরমিটরি বা আবাসিক কোয়ার্টার নেই। ফলে তাদের অধিকাংশকে স্থানীয় বাজার ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মেস বা ভাড়া বাসায় বসবাস করতে হচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে জরাজীর্ণ বাসা কিংবা পাহাড়ি ঘরে বসবাস করছেন, যেখানে ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাও অনুপস্থিত।

 

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লামা থানা গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবর আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাইশারী ও গজালিয়া থানাকে নিয়ে এটি মহকুমায় উন্নীত হয়। ১৯৮৩ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সময় লামাকে জেলা ঘোষণাও করা হয়েছিল, যদিও তা মাত্র তিন দিন স্থায়ী ছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে একটি জেলা শহরে যেসব সরকারি দপ্তর থাকার কথা, তার প্রায় সবগুলোই বর্তমানে লামা উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগ ও ডাক বিভাগ বাদে বর্তমানে লামা উপজেলায় সরকারের ৩৩টি দপ্তর রয়েছে। এসব দপ্তরে ১৪২ জন কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ১৮৩ জন কর্মচারীসহ মোট ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মরত আছেন।

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন সংকটের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। এতে সময় অপচয়ের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ছে, যা দাপ্তরিক কার্যক্রম ও নাগরিক সেবার ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে জরুরি সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

লামা উপজেলা প্রশাসনের উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা উচিংমে চাক বলেন, “নারী কর্মকর্তা হিসেবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবাসন সুবিধার অভাব বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে। পরিবার নিয়ে থাকার মতো উপযুক্ত বাসা পাওয়া কঠিন, আর পেলেও ভাড়া অত্যন্ত বেশি।”

 

সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা বামং সিং মার্মা বলেন, “অফিস শেষে বিশ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশও পাওয়া যায় না। অনেক সময় ভাঙাচোরা মেসবাড়িতে থাকতে হয়। একটি ডরমিটরি নির্মাণ হলে কাজের পরিবেশ ও মনোযোগ দুটোই বাড়বে।”

 

সহকারী তথ্য অফিসার মোহাম্মদ রাশেদুল হক রাসেদ বলেন, “দূর-দূরান্ত থেকে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েই আবাসন সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী মেসজীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।”

 

উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কাঞ্চন দে বলেন, “পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের সেবায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যূনতম আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একটি আধুনিক ডরমিটরি বা আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ এখন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।”

 

লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, বান্দরবানের সাতটি উপজেলার মধ্যে ছয়টিতে অফিসার্স কোয়ার্টার ও ডরমিটরি থাকলেও লামায় এখনো এমন কোনো আবাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

 

তিনি আরও জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক গেজেটেড কোয়ার্টার ও ডরমিটরি নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করে প্রস্তাবনাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, দ্রুত আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে একদিকে যেমন তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে নাগরিক সেবাও আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে।