টাকার বদলে কাসার থালা

অসহায় প্রসূতির বিনামূল্যে সিজারের দায়িত্ব নিলেন ‘নিউ লাইফ ক্লিনিক’

রাসেল মাহামুদ, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৪:২৯ অপরাহ্ণ
অসহায় প্রসূতির বিনামূল্যে সিজারের দায়িত্ব নিলেন ‘নিউ লাইফ ক্লিনিক’
৮১

গর্ভধারিণী মায়ের প্রসব বেদনা উঠেছে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকটে দিশেহারা পরিবার। পকেটে নেই চিকিৎসার খরচ, এমনকি দূরের হাসপাতালে যাওয়ার ভাড়াও জোগাড় করার সামর্থ্য নেই। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে একটি কাসার থালা সম্বল করে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে এসে আশ্রয় খোঁজেন অসহায় এক পরিবার। তাদের সেই আকুতি দেখে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান নিউ লাইফ ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী তাওহীদ রহমান।

ঘটনাটি ঘটেছে পলাশবাড়ী উপজেলার নিউ লাইফ ক্লিনিকে। অসহায় ওই প্রসূতি মায়ের নাম শ্রী শ্যামা রানী।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ করেই শ্যামা রানীর তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে প্রথমে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের (রেফার) পরামর্শ দেন। কিন্তু রংপুরে নিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় পরিবারটি চরম অসহায় অবস্থায় পড়ে। একপর্যায়ে তারা রোগীকে নিয়ে পলাশবাড়ীর নিউ লাইফ ক্লিনিকে আসেন।

ক্লিনিকে এসে রোগীর স্বজনেরা স্বত্বাধিকারী তাওহীদ রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। তারা জানান, তাদের কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। সম্বল বলতে রয়েছে শুধু একটি কাসার থালা। সেটি বিক্রি করে সিজারের খরচ চালানোর আশায় তারা ক্লিনিকে এসেছেন। পরিবারের সদস্যরা আকুতি জানিয়ে বলেন, “আমাদের কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। শুধু এই একটি কাসার থালা আছে। এটি বিক্রি করেই সিজারের খরচ চালাতে চাই। দয়া করে আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না।”

অসহায় পরিবারের এমন করুণ বাস্তবতা এবং কাসার থালা সম্বল করে চিকিৎসার আবেদন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তাওহীদ রহমান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কাসার থালাটি ফিরিয়ে দেন এবং জানান, চিকিৎসার জন্য তাদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা করেন।

পরবর্তীতে তার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কোনো ধরনের খরচ ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন হয় শ্রী শ্যামা রানীর সিজারিয়ান অপারেশন। বর্তমানে মা ও নবজাতক সন্তান উভয়েই সুস্থ রয়েছেন।

তবে মানবিকতার এই উদ্যোগ শুধু সিজারিয়ান অপারেশনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাওহীদ রহমান প্রসূতি মায়ের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, নতুন কাপড় এবং নবজাতক শিশুর জন্য নতুন জামাকাপড়ের ব্যবস্থাও করেন। পাশাপাশি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর ওই পরিবারের আগামী এক মাসের পারিবারিক ব্যয়ভার বহনের দায়িত্বও গ্রহণ করেন।

এ বিষয়ে নিউ লাইফ ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী তাওহীদ রহমান বলেন, “মানুষ মানুষের জন্য। একজন সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কাসার থালা সম্বল করে আসা পরিবারটির অসহায়ত্ব দেখে আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি। মা ও শিশুটি সুস্থভাবে বাড়ি ফিরছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

এদিকে, অর্থাভাবে যেখানে চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, সেখানে নিউ লাইফ ক্লিনিকের এই মানবিক সহায়তা শ্যামা রানীর পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে আশীর্বাদস্বরূপ। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকাজুড়ে তাওহীদ রহমান এবং নিউ লাইফ ক্লিনিকের এই উদ্যোগের প্রশংসা করছেন স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ।