ঘুষ ছাড়া মিলছে না সেবা—বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ
গাজাীপুর বাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, ঘুষ বাণিজ্য এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদারের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, অফিসে সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের কোনো অনুমোদিত কর্মকর্তা বা কর্মচারী না হয়েও সুমন নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসে বসে কম্পিউটার পরিচালনা করছেন এবং বিভিন্ন ভূমি-সংক্রান্ত নথি প্রস্তুতের কাজ করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী আব্দুল হাই সিকদারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি খারিজ, নামজারি ও খাজনার আবেদন সংগ্রহসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভূমি অফিস পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সুমন নামে ওই ব্যক্তি কম্পিউটারে বসে বিভিন্ন আবেদন ও নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত না হয়েও তিনি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে একজন বহিরাগত ব্যক্তি সরকারি অফিসের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন এবং কার স্বার্থে তিনি এসব দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খাজনা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো জমির প্রকৃত খাজনা কয়েক লাখ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও তা কম দেখিয়ে নির্ধারণ করা হয়। বিনিময়ে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হয় বলে দাবি স্থানীয়দের। এতে একদিকে সরকারি রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে খারিজ, নামজারি ও ভূমি-সংক্রান্ত ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে আব্দুল হাই সিকদারের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়। তাদের অভিযোগ, চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গোপন সূত্রে জানা যায়, নলগাঁও সিকদারবাড়ির মৃত কাদু সিকদারের ছেলে আব্দুল হাই সিকদার ১৯৮৯ সালে ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়দের দাবি, চাকরিকালীন সময়ে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
স্থানীয় সূত্রমতে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উত্তর বিলাসপুর সড়কের ভাঙা মসজিদসংলগ্ন এলাকায় প্রায় আট কাঠা জমির ওপর নির্মিত পাঁচতলা একটি ভবন, একটি মার্কেট এবং একটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে তার পরিবারের মালিকানায়। এছাড়া নিজ গ্রাম নলগাঁও নতুনবাজার এলাকায় তিনতলা মার্কেটসহ আরও একাধিক জমি ও স্থাপনার মালিকানা রয়েছে বলে জানা গেছে। বিলাসপুর এলাকার বাসিন্দা ও ঠেলাগাড়িচালক জলিল জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর কাছে এসব সম্পত্তি আব্দুল হাই সিকদারের বলে পরিচিত।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আব্দুল হাই সিকদারের স্ত্রী শিরিন সুলতানা গাজীপুরের বাড়ি ও মার্কেট তাদের বলে স্বীকার করেন। পরবর্তীতে আব্দুল হাই সিকদারও গাজীপুর ও কাপাসিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার মালিকানা তাদের পরিবারের বলে জানান।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ২০২৫ সালে একটি নারী-সংক্রান্ত ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করেছিল এবং তিনি কয়েকদিন কারাগারেও ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ও বিতর্কের জন্ম হলেও কী কারণে তিনি এখনও একই পদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

