চেমী রেঞ্জে কাঠ পাচার সিন্ডিকেট, বন বিভাগের যোগসাজশের অভিযোগ
সবুজ পাহাড় আর বিস্তীর্ণ অরণ্যের অপার সৌন্দর্যে ঘেরা বান্দরবানের চেমী রেঞ্জ। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের বিরুদ্ধেই যখন বন ধ্বংসে মদদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তখন রক্ষকই যেন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, চেমী রেঞ্জে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দিনের আলোতেই চলছে সরকারি বনের গাছ কাটার মহোৎসব। আর এই বন উজাড়ের পেছনে বন বিভাগের এক কর্মকর্তার অলিখিত গ্রিন সিগন্যাল কাজ করছে বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেমী রেঞ্জের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে নির্বিচারে কেটে নেওয়া হচ্ছে মূল্যবান সেগুন, গর্জনসহ প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা নানা প্রজাতির গাছ। সংরক্ষিত বনের এসব কাঠ পাচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, চেমী রেঞ্জের কর্মকর্তা ছানাউল্লাহর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়েই এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের মাসোহারা ও গোপন সমঝোতার বিনিময়ে কাঠ চোরাকারবারিদের জন্য অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ডলুপাড়া, চেমীরমুখ, গোয়ালিয়াখোলা, স্বর্ণমন্দির, কুহালং, ডাকবাংলা ও রাজবিলা এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে মৌখিক ইঙ্গিতে বন উজাড়ের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন তাদের চোখের সামনেই বড় বড় গাছ কেটে বন ধ্বংস করা হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো মামলার ভয় দেখানো হয়। তার দাবি, রেঞ্জ কর্মকর্তা ছানাউল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে অবগত এবং তার ঘনিষ্ঠ লোকজনই এসব কর্মকাণ্ড তদারকি করে পথ পরিষ্কার করে দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা দিলে অনেক কিছুই বৈধ হয়ে যায়, আর টাকা না থাকলে সেটিই অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও চেমী রেঞ্জে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় হতে থাকায় স্থানীয় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়ছে। অথচ রহস্যজনক কারণে এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় বন প্রশাসন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, চেমী রেঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলে এভাবে নির্বিচারে গাছ কাটা অব্যাহত থাকলে তা শুধু স্থানীয় নয়, পুরো বান্দরবানের পরিবেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাদের ভাষায়, সরকারি দায়িত্বে থাকা কেউ যদি বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত কোনো চক্রের অংশ হয়ে থাকেন, তাহলে বন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তারা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রেঞ্জ কর্মকর্তা ছানাউল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পাশাপাশি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতেও সম্মতি জানাননি।
সবুজ পাহাড়কে ধীরে ধীরে অনুর্বরতার দিকে ঠেলে দেওয়া এই আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে কবে—এমন প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে চেমী রেঞ্জের অবশিষ্ট বনভূমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

