বুদ্ধির প্রতি আকর্ষণ ও স্যাপিওসেক্সুয়াল: নিজেকে সামলানোর সাধনা ও বিজ্ঞান

বিশেষ প্রতিবেদক: হাফিজ আল মিথুন প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩০ অপরাহ্ণ
বুদ্ধির প্রতি আকর্ষণ ও স্যাপিওসেক্সুয়াল: নিজেকে সামলানোর সাধনা ও বিজ্ঞান
৭৫

মানব মনের আকর্ষণের রূপ বিচিত্র ও বহুমাত্রিক। কেউ মুগ্ধ হন শারীরিক সৌন্দর্যে, কেউ মোহিত হন সুমিষ্ট কণ্ঠে, আবার কেউবা হৃদয়ের টান খুঁজে পান কথার প্রখর বুদ্ধিবৃত্তিক ধার ও প্রজ্ঞায়। বর্তমান যুগে অন্যের গভীর মেধা ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি তীব্রভাবে আকৃষ্ট হওয়া ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’ নামে। আপাতদৃষ্টিতে শব্দটি আধুনিক ও নতুন শোনালেও প্রজ্ঞার প্রতি মানুষের এই চিরন্তন আকর্ষণ আদতে সৃষ্টিজগতের সূচনালগ্ন থেকেই বিদ্যমান। এমন অনুভূতির ক্ষেত্রে মূল দার্শনিক সত্যটি হলো, আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া বা কোনো অনুভূতির উদ্রেক ঘটা মানব প্রকৃতির স্বভাবজাত এবং তা মানুষের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তবে সেই আকর্ষণের তীব্রতায় কার সাথে কতদূর অগ্রসর হওয়া সমীচীন, সেই চূড়ান্ত সীমারেখা নির্ধারণের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্যক্তির নিজের বিবেচনাবোধের ওপরই নির্ভর করে। নারী ও পুরুষ পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া প্রকৃতির শাশ্বত নিয়মেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাতে কোনো অস্বাভাবিকতা বা লজ্জার অবকাশ নেই; কিন্তু সমস্যা ও বিচ্যুতির সূচনা তখনই ঘটে যখন এই অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণই ব্যক্তির সচেতন বিবেক ও সিদ্ধান্তকে চালিত করতে শুরু করে।

অন্যের বুদ্ধিমত্তার প্রতি যৌন বা মানসিক টান নিয়ে মনস্তত্ত্বের জগতে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রণিধানযোগ্য গবেষণাটি পরিচালনা করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার গবেষক গিলেস গিগন্যাক ও তার সহযোগী গবেষক দল। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ইন্টেলিজেন্স’ (Intelligence) জার্নালে প্রকাশিত তাদের গবেষণাপত্রে উঠে আসে যে, বেশ কিছু মানুষ সরাসরি স্বীকার করেছেন তীব্র বুদ্ধিমত্তাই তাদের মূল যৌন আকর্ষণের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে গবেষণাটি মূলত অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মমূল্যায়ন ও অনলাইনভিত্তিক নমুনার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যার সিংহভাগ উত্তরদাতা ছিলেন পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতিনিধি। ফলে বৈশ্বিক শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এটিকে স্বতন্ত্র কোনো যৌন অভিমুখিতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি; বরং অধিকাংশ সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকের দৃষ্টিতে এটি একজন মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ বা বিশেষ জীবনযাত্রাগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশমাত্র।

অন্যদিকে আবেগ ও প্রবৃত্তি সংবরণ বা আত্মসংযমের কার্যকারিতা প্রমাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও উল্লেখযোগ্য গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে নিউজিল্যান্ডের ডুনেডিন শহরে। প্রখ্যাত গবেষক টেরি মফিট ও তার সহকর্মীরা প্রায় এক হাজার শিশুর ওপর তাদের জন্মমুহূর্ত থেকে বত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালান। দীর্ঘ এই গবেষণার ফলাফল ২০১১ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘পিএনএএস’ (PNAS) জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে, শৈশবে যারা নিজেদের আবেগ, তাড়না ও ঝোঁক বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিল, পরিণত বয়সে তাদের শারীরিক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক আয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিল এবং তারা নানাবিধ সামাজিক ও অপরাধমূলক বিপদে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে মুক্ত ছিল। পরিবারের সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক পটভূমি কিংবা জন্মগত বুদ্ধ্যঙ্ক (আইকিউ) বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই ফলাফলে কোনো হেরফের হয়নি। এর মধ্য দিয়ে এটি সুস্পষ্ট যে, আত্মসংযম কোনো জন্মগত ভাগ্য বা অলৌকিক ক্ষমতা নয়, বরং এটি সচেতন অভ্যাসের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য এক মানবীয় দক্ষতা; যদিও একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের একক প্রজন্মের গবেষণা গোটা বিশ্বের বৈচিত্র্যময় সব সমাজের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মানদণ্ড নাও হতে পারে।

বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রার বাস্তবতায় চারপাশের পরিবেশ নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন, গভীর রাত জেগে ভার্চুয়াল আড্ডা এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সঙ্গে আকস্মিক ও অনিয়ন্ত্রিত ঘনিষ্ঠতা তৈরি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। অপরদিকে সামাজিক ও পারিবারিক বিধিবিধানের চাপে অনেকে নিজের তীব্র অনুভূতিকে জোরপূর্বক অবদমিত করে রাখেন। কিন্তু অনুভূতিকে জোর করে চেপে রাখা আর সচেতনভাবে নিজেকে সামলানো কখনই এক বিষয় নয়। অনুভূতি বা কামনাকে জোরপূর্বক অবদমিত করলে ভেতরে ভেতরে তার তীব্রতা কেবল বৃদ্ধিই পায়; পক্ষান্তরে আত্মসংযম মানে হলো নিজের প্রবৃত্তিকে সঠিকভাবে চিনে ও উপলব্ধি করে বাস্তবসম্মত ও বিবেকপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

প্রাচীন সুফি সাধক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদরাও আত্মশুদ্ধির এই মৌলিক সত্যকেই ধারণ করতেন। তাঁরা ভেতরের তীব্র চাওয়া বা প্রাকৃতিক অনুভূতিকে সরাসরি অস্বীকার করার কথা বলেননি, বরং মানব প্রবৃত্তি বা ‘নফস’কে গভীরভাবে চিনে তাকে নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার উপদেশ দিয়েছেন। কারণ নিজেকে জানা ও নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করাই ছিল তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনার মূল ভিত্তি। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আল-গাজ্জালি (র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থে অনুরাগের স্তরবিন্যাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, মানুষের বাহ্যিক রূপ-লাবণ্য নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মেধা, জ্ঞান এবং আত্মিক অন্তর্দৃষ্টি বা ‘বাছিরত’-এর জ্যোতি চিরন্তন ও অবিনশ্বর। মানব আত্মা যখন কোনো উচ্চতর আধ্যাত্মিক জ্ঞান কিংবা প্রখর বুদ্ধিমত্তার সান্নিধ্য লাভ করে, তখন সে সহজাত নিয়মেই তার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হয়ে পড়ে।

বাস্তব জীবনে মানুষকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে ও তাদের অন্তর্জগতের স্বরূপ উন্মোচন করে এই ধ্রুব সত্যই প্রতীয়মান হয় যে, ক্ষণিকের মোহ কিংবা কেবল শারীরিক টান সময়ের পরিক্রমায় ফিকে হতে বাধ্য; কিন্তু চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঔজ্জ্বল্যের দ্যুতি কখনই ম্লান বা পুরনো হয় না। সুফি সাধকদের নিরাকার স্রষ্টাপ্রেমের মতোই কোনো মানুষের গভীর প্রজ্ঞা ও প্রচ্ছন্ন মেধার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মধ্য দিয়েও এক ধরনের পবিত্র ও আধ্যাত্মিক ঘরানার ভালোবাসার উন্মেষ ঘটে। ফলে প্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরা খুব জটিল কোনো কাজ নয়, যদি মানুষ নিজের আত্মোন্নয়নে মনোনিবেশ করে। নিজের সঙ্গ, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং ব্যক্তিগত সময়কে সুপরিকল্পিতভাবে সাজাতে পারলেই জীবনের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা সম্ভব।

বুদ্ধির প্রতি তীব্র আকর্ষণ কিংবা প্রজ্ঞার প্রেম মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রুচিবোধের এক বিশেষ রূপ হলেও সেই অনুভূতির সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। আধুনিক প্রযুক্তির মোহে কিংবা ক্ষণস্থায়ী আবেগে গা না ভাসিয়ে আত্মসংযমকে দৈনন্দিন চর্চায় রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি। প্রবৃত্তি বা নফসের অন্ধ তাড়নায় পরিচালিত না হয়ে বিবেক ও মেধার আলোয় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই ব্যক্তিগত জীবনে মানসিক প্রশান্তি ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।