শ্রমিকের ঘামে মালিকের বিলাসিতা, বেতন চাইলে পুলিশের লাঠি—গাজীপুরে অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান কোথায়?

ফাহিম ফরহাদ, গাজীপুর: প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৯ অপরাহ্ণ
শ্রমিকের ঘামে মালিকের বিলাসিতা, বেতন চাইলে পুলিশের লাঠি—গাজীপুরে অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান কোথায়?
৭০

বকেয়া বেতন রেখে মালিকেরা কোথায় যান, কার ছত্রচ্ছায়ায় থাকেন? শ্রমিকের পাওনা আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়, আর গণমাধ্যমের নজরদারিই বা কতটা?

নিজের ঘাম ঝরিয়ে, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাঁরা শিল্পকারখানার চাকা সচল রাখেন, উৎপাদন বাড়ান, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের শ্রমেই সমৃদ্ধ হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সেই শ্রমিকের পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে মালিকের সম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি ও দামি গাড়ি। অথচ সেই শ্রমিককেই নিজের ন্যায্য বেতন আদায়ে রাস্তায় নামতে হয় কেন?

দিনের পর দিন কাজ করেও প্রাপ্য টাকা না পেয়ে কেন তাঁদের পরিবারকে কাটাতে হবে অনিশ্চয়তা আর দুর্ভোগে? বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলনে নামলেই কেন কোনো কোনো ঘটনায় তাঁদের মুখোমুখি হতে হয় পুলিশের লাঠিপেটা, টিয়ারগ্যাস কিংবা রাবার বুলেটের?

গাজীপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ এবং মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা বারবার সামনে আসছে। প্রতিবারই শ্রমিকদের আন্দোলনে ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল, বাড়ছে জনদুর্ভোগ, বিঘ্নিত হচ্ছে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ।

কিন্তু যে সংকট থেকে এসব আন্দোলনের জন্ম, সেই বকেয়া বেতন পরিশোধের নিশ্চয়তা কোথায়? শ্রমিকের পাওনা আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি? নাকি পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে আশ্বাস দিয়ে সাময়িকভাবে আন্দোলন থামানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে উদ্যোগ?

বেতন নেই, থমকে যায় পুরো পরিবার
একজন শ্রমিকের কাছে মাস শেষে পাওয়া বেতন কেবল কিছু টাকার অঙ্ক নয়; এটি তাঁর পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই অর্থ দিয়েই দিতে হয় বাসাভাড়া, কিনতে হয় চাল-ডাল, মেটাতে হয় সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ।

বেতন বন্ধ হয়ে গেলে একদিকে বাড়িওয়ালার তাগাদা, অন্যদিকে দোকানের বকেয়া।
পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তানের স্কুলের খরচ, পরিবারের খাবার কিংবা জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝা বাড়ে।

দিনের পর দিন শ্রম দিয়েও যখন নিজের উপার্জনের টাকা হাতে আসে না, তখন শ্রমিকের জীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
অনেক শ্রমিক কারখানা কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে সমস্যার কথা জানানোর পরও কার্যকর সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ করেন। বারবার অপেক্ষা, আশ্বাস আর অনিশ্চয়তার পর শেষ পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। প্রশ্ন হলো, শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা পেতে কেন এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে?

আশ্বাসের পর আশ্বাস, পাওনা আদায় অনিশ্চিত
শ্রমিকদের অভিযোগ, বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে অনেক সময় দ্রুত পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বেতন না পেয়ে শ্রমিকেরা ফের রাজপথে নামেন।
এভাবেই একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

একদিকে শ্রমিকদের ক্ষোভ, অন্যদিকে মহাসড়কে যানজট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের হস্তক্ষেপ ঘটে, কোথাও বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। কোনো ঘটনায় টিয়ারগ্যাস বা রাবার বুলেট ব্যবহারের খবর সামনে এলে প্রশ্ন ওঠে, শ্রমিকের পাওনা পরিশোধের মূল সমস্যাটির সমাধান কতটা এগোল?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনদুর্ভোগ কমানো অবশ্যই জরুরি। তবে বকেয়া বেতনই যদি আন্দোলনের মূল কারণ হয়, তাহলে সেই পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত না করে শুধু আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কি স্থায়ী সমাধান সম্ভব?

বকেয়া রেখে মালিকেরা কোথায় যান?
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বেতন-ভাতা নিয়ে বিরোধের পর কোনো কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, মালিকপক্ষের অনুপস্থিতি কিংবা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। তখন শ্রমিকদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—তাঁদের পাওনা আদায় হবে কীভাবে?

যে শ্রমিকেরা দিনের পর দিন উৎপাদন সচল রেখেছেন, তাঁদের বেতন-ভাতা বকেয়া রেখে কোনো মালিক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি দায় এড়িয়ে গেলে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে পাওনা আদায় এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

কিন্তু বাস্তবতা যাচাইয়ের পাশাপাশি আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। কারখানা বন্ধের পেছনে প্রকৃত কারণ কী? মালিকপক্ষের আর্থিক সংকট থাকলে তার স্বচ্ছ হিসাব কোথায়? শ্রমিকের পাওনা পরিশোধের পরিকল্পনা কী? আর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনুপস্থিত থাকলে তাঁদের খুঁজে বের করে জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ কতটা কার্যকর?

মালিকেরা কার ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছেন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে পালিয়ে যাচ্ছেন—এমন অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ থাকা প্রয়োজন। শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় প্রশাসন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জরুরি।

শ্রমিকের দুর্দশা, গণমাধ্যমের নজর কোথায়?
শ্রমিক অসন্তোষের খবর সামনে এলে সাধারণত সড়ক অবরোধ, যানজট, পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা কিংবা বলপ্রয়োগের ঘটনাই বেশি আলোচনায় আসে। কিন্তু আন্দোলনের পেছনের গল্প—কত মাসের বেতন বকেয়া, কত পরিবার সংকটে, শ্রমিকেরা কতবার কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছেন, আশ্বাসের পর কী ঘটেছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

গণমাধ্যম কি শুধু সড়কের পরিস্থিতি তুলে ধরবে, নাকি শ্রমিকের পাওনা আদায়ের অগ্রগতি ও মালিকপক্ষের জবাবদিহিও অনুসরণ করবে? বকেয়া বেতনের খবর প্রথম দিন প্রকাশের পর পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ পরিশোধ হলো কি না, শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে পারলেন কি না, অভিযুক্ত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো কি না—এসব বিষয়েও ধারাবাহিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

তবে সব গণমাধ্যম শ্রমিকদের দুর্দশা এড়িয়ে চলে—এমন সাধারণীকরণও সঠিক নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, শ্রমিকের পাওনা ও জবাবদিহির বিষয়টি কতটা ধারাবাহিকভাবে সংবাদে গুরুত্ব পাচ্ছে? কোন কোন সংকট সংবাদ প্রকাশের পরও অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে?

কারণ, একটি আন্দোলনের দিনের খবর প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সংকটের কারণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং সমাধানের অগ্রগতি অনুসরণ করাও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শ্রমিকের পাওনা দয়া নয়, অধিকার
শ্রমিক তাঁর শ্রম বিক্রি করেন, দয়া ভিক্ষা করেন না। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজের বিনিময়ে প্রাপ্য পারিশ্রমিক পাওয়া তাঁর অধিকার। অথচ সেই অধিকার আদায়ে তাঁকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হলে, বারবার কর্তৃপক্ষের দরজায় ঘুরতে হলে কিংবা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করতে হলে তা শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের জন্য উদ্বেগজনক।

শিল্পকারখানা সচল রাখা, উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। তবে সেই সমন্বয়ের ভিত্তি হতে হবে ন্যায্যতা, দায়িত্বশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা। শ্রমিকের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতার দায় যথাযথ তদন্ত ছাড়া শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

প্রয়োজন বকেয়া বেতন পরিশোধে কার্যকর নজরদারি, শ্রমিকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। একই সঙ্গে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর অধিকার রক্ষা এবং বলপ্রয়োগের অভিযোগ থাকলে তারও যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।

শেষ প্রশ্ন—শ্রমিকের ঘামের মূল্য কে দেবে?
যে শ্রমিকের শ্রমে কারখানার চাকা ঘোরে, তাঁর ঘরে যদি খাবারের সংকট দেখা দেয়, সন্তানের পড়াশোনা ব্যাহত হয় কিংবা চিকিৎসার অভাবে পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে, তাহলে শিল্পের সমৃদ্ধির প্রকৃত অর্থ কোথায়?

মালিকের সম্পদ বাড়বে, শিল্পের উৎপাদন বাড়বে—কিন্তু সেই উৎপাদনের পেছনে থাকা শ্রমিকের জীবন যদি অনিশ্চয়তায় আটকে থাকে, তাহলে এ উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

গাজীপুরসহ দেশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান চাইলে শুধু আশ্বাস কিংবা সাময়িক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। দরকার সময়মতো বেতন পরিশোধ, বকেয়া পাওনা আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা।

শ্রমিকের ঘামে শিল্প সমৃদ্ধ হবে, অথচ সেই শ্রমিকই নিজের পাওনা চাইতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়বেন—এ বাস্তবতা আর কত দিন চলবে? বকেয়া বেতন রেখে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব কে দেবে? শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?