গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (গাসিক) অঞ্চল-২ এর অধীন পূবাইল জোনাল অফিসে কর আদায় শাখায় ব্যাপক ও নীরব দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অফিসের কর নির্ধারণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের প্রত্যক্ষ মদদে এবং তার নেতৃত্বেই অধীনস্থ কর্মচারীরা মিলে গড়ে তুলেছে এক বিশাল দুর্নীতির সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের গাড়ির চালক রেজাউল বর্তমানে এই কর আদায় শাখায় মাস্টার রোলে কর্মরত থেকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো লাখ লাখ টাকা কর আদায় ও আত্মসাৎ করে নিচ্ছেন। সাধারণ বাড়ির মালিকদের আইনি ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং কর পরিশোধের নামে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না এই অসাধু কর্মচারী।
সম্প্রতি পূবাইল অফিসের অধীন গাসিকের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য ক্রয়কৃত একটি বাড়ির মালিক এই দুর্নীতির চরম শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগী ওই বাড়ির মালিক ক্ষোভের সঙ্গে জানান, কিছুদিন আগে পূবাইল অফিস থেকে রেজাউল নামের ওই কর কর্মকর্তা তাকে সরাসরি ফোন দিয়ে জানান যে, তার বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স বা কর বাবদ ৩৫ হাজার টাকা বকেয়া এসেছে। দ্রুত তার সঙ্গে যোগাযোগ না করলে বাড়ির মালিকের নামে আইনি নোটিশ প্রেরণ করা হবে বলে চরম হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে হয়রানির ভয়ে ওই ভুক্তভোগী রেজাউলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, তার বাড়ির কর মূলত ৭৫ হাজার টাকার ওপরে এসেছে। তবে রেজাউল তাকে অবৈধ প্রস্তাব দিয়ে বলেন, “আপনি যদি আমাকে নগদ ৪০ হাজার টাকা দেন, তাহলে আমি অফিসের সবকিছু ঠিকঠাক করে দেব।”
অফিসের একজন কর্মচারীর এমন অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হয়ে ভুক্তভোগী বাড়ির মালিক ন্যায়বিচারের আশায় সরাসরি কর নির্ধারণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু প্রতিকার পাওয়ার বদলে সেখানে তিনি আরও বড় হয়রানির শিকার হন, কারণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান সমস্যা সমাধানের বদলে তার কাছে উল্টো আরও বেশি অঙ্কের অর্থ দাবি করে বসেন। অথচ বাড়ির পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ওই বাড়ির আগের মালিক ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছরের কর বাবদ সিটি কর্পোরেশনকে পরিশোধ করেছিলেন মাত্র ১০ হাজার ৮০০ টাকা। সেখানে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে দুর্নীতিবাজ মিজানুর রহমান ও তার সহযোগী রেজাউল মাত্র পাঁচ বছরের জন্য ওই বাড়ির কর নির্ধারণ করেছেন ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং তা মওকুফ বা কমিয়ে দেওয়ার শর্তে প্রকাশ্যে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূবাইল জোনাল অফিসের অধীনে থাকা মোট ৪টি ওয়ার্ডেই দীর্ঘদিন ধরে এমন নীরব দুর্নীতি ও প্রকাশ্য চাঁদাবাজি চলছে। সেবা নিতে আসা সাধারণ নাগরিকদের নানাভাবে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কারণে একদিকে যেমন সাধারণ করদাতারা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন হারাচ্ছে তার বিপুল পরিমাণ বৈধ রাজস্ব। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের কষ্টের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এই অসহনীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী করদাতারা অবিলম্বে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মহোদয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা দ্রুত সরজমিন তদন্ত সাপেক্ষে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক দোষী ব্যক্তির কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
সিটি কর্পোরেশনের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য ও সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনা চরম হতাশাজনক। করদাতারা যেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজস্ব প্রদান করে শহরের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান, সেখানে অসাধু কর্মকর্তাদের এমন চাঁদাবাজি তাদের নিরুৎসাহিত করছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে পূবাইল জোনাল অফিসে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে নাগরিকদের মাঝে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরে আসে।

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার