প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

ইনসাফ হাসপাতালে ডেন্টাল চিকিৎসার আড়ালে রমরমা ভুয়া চিকিৎসা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডেন্টাল চিকিৎসার আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ ছাড়াই রোগী দেখা, পরীক্ষা দেওয়া, ব্যবস্থাপত্র দেওয়া ও সার্জারিসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিম পাইকপাড়ায় অবস্থিত ইনসাফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল এন্ড কনসালটেশন সেন্টারের ডেন্টাল কেয়ারে ডেন্টিস্ট শাহীন মো. (আক্কাস) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে হাতেনাতে ধরার পর দেখাতে পারেননি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা সনদ। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সনদ থাকার কথা জেনেই তাঁকে চেম্বার ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

দৈনিক নববাণীর বিশেষ অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওই ডেন্টাল কেয়ারে নিয়মিত চেম্বার করছেন শাহীন মো. (আক্কাস)। নিজের নামের আগে ‘ডেন্টিস্ট’ ব্যবহার করে রোগী দেখা, ব্যবস্থাপত্র দেওয়া, সার্জারিসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং পরামর্শ ফি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আক্কাস নিজের নামে একটি ব্যবস্থাপত্রও তৈরি করেছেন। সেখানে ডি.এম.পি.ডি.টি. ও এন.ওয়াই.টি.টি.সি. (ঢাকা)সহ বিভিন্ন যোগ্যতার উল্লেখ থাকলেও নেই কোনো সনদ নম্বর। একই ব্যবস্থাপত্রে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধিত একজন বিডিএস চিকিৎসকের সিলও ব্যবহার করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিডিএস চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশেই ভুয়া ডেন্টিস্ট আক্কাস তার এই অন্যায় কাজ (চিকিৎসা সেবা) করে বেড়াচ্ছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আক্কাসের ব্যবস্থাপত্রে ব্যবহৃত বিডিএস চিকিৎসক হিসেবে ডা. রুহান আজিম (রিফাত)-এর সিল রয়েছে। তাঁর বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বর ১৬৪৮২।
অন্যদিকে, ডা. রুহান আজিম (রিফাত) এবং ডা. রাকিবুল হাসানও বিডিএস চিকিৎসক ডা. নাসরিন জাহান সুলতানার নামে তৈরি ব্যবস্থাপত্রে নিজেদের সিল ব্যবহার করে প্রেসক্রিপশন করেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। ডা. রাকিবুল হাসানের বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বর ১৬৩১০।

ডা. নাসরিন জাহান সুলতানার নিবন্ধন নম্বর দিয়ে বিএমডিসির ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, তাঁর নিবন্ধনের মেয়াদ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেই শেষ হয়েছে। ফলে নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ওই চিকিৎসকের নামে তৈরি ব্যবস্থাপত্র ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিজের চিকিৎসাসেবার বিষয়ে জানতে চাইলে আক্কাস বলেন, “ভাই, কিছু করে ত খেতে হবে। কাছের এবং পরিচিত লোকজন আমার কাছে আসে চিকিৎসা নিতে। আমার যেহেতু ২৫ বছরের সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেই হিসেবে আমি চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নেই।”
ডা. রুহান আজিমের সিল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকের অনুমতি নিয়েই ওই সিল ব্যবহার করেন।
চেম্বার ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে আক্কাস জানান, মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় ইনসাফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চেম্বারটি নিয়েছেন। চেম্বারের ভেতরে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জাম তাঁর ব্যক্তিগত বলেও দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে সহায়তার জন্য তাঁর একজন নারী সহযোগী রয়েছেন।

আক্কাসের দাবি, ডা. রাকিবুল হাসান ও ডা. রুহান আজিমকে সপ্তাহে এক দিন করে মোট দুই দিন চেম্বারে বসান। এর জন্য প্রত্যেককে সপ্তাহে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই চিকিৎসকের সম্মানী বাবদ মাসে মোট ৪০ হাজার টাকা, চেম্বার ভাড়া ১০ হাজার টাকা এবং সহযোগীর বেতনসহ যাবতীয় ব্যয় তিনি নিজেই বহন করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, গত ১০ মাস ধরে ইনসাফ স্পেশালাইজড ডেন্টাল কেয়ারে চেম্বার করছেন তিনি। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক সনদ না থাকায় বিকল্প হিসেবে ডা. নাসরিন জাহান সুলতানাকে চেম্বারে বসাতেন। গত ৭ আগস্ট ডা. নাসরিন জাহান সুলতানা মারা গেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। আক্কাসের ভাষ্য, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ওই চিকিৎসক চেম্বার করতেন। তবে বিএমডিসির ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর নিবন্ধনের মেয়াদ ২০২৫ সালের নভেম্বরেই শেষ হয়েছে।

উল্লেখ্য, ভুয়া ডেন্টিস্ট আক্কাসের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ধরমন্ডল গ্রামে।

এ বিষয়ে ডা. রাকিবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক নববাণীকে বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি সেখানে চেম্বার করছেন। ডা. নাসরিন জাহান সুলতানার নামে তৈরি ব্যবস্থাপত্রে নিজের সিল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টি এক ধরনের অন্যায়। আগামী রবিবার থেকে আমি নতুন প্যাড ছাড়া প্রেসক্রিপশন করব না।”
অন্যদিকে, ডা. রুহান আজিম (রিফাত) জানান, তিনি গত তিন মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে চেম্বার করছেন। ডা. নাসরিন জাহান সুলতানার নামে তৈরি প্যাডে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এভাবে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া যায় এবং এতে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে তিনি মনে করেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকের পরিচয়পত্রের নম্বর জানতে চান। নম্বর দেওয়ার পর পত্রিকার ডিএফপি নম্বর জানতে চান এবং বিএমডিসির মতো সাংবাদিকদের কোনো ওয়েবসাইট আছে কি না, তা জানতে চান। একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকের সাথে হুমকিস্বরূপ আচরণ করেন।

ইনসাফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল এন্ড কনসালটেশন সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রবিউল আলম বলেন, ডেন্টিস্ট আক্কাস মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় চেম্বারটি নিয়েছেন।
কীসের ভিত্তিতে বা কী যাচাই করে তাঁকে চেম্বার ভাড়া দেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে রবিউল আলম দাবি করেন, আক্কাসের চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক সনদ রয়েছে।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, এমবিবিএস অথবা বিডিএস সনদ ছাড়া ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার সুযোগ নেই। এমন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি হাসপাতালের লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে।

সচেতন নাগরিকদের দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় আক্কাসের মতো এমবিবিএস ও বিডিএস পরিচয়ে এমন আরও ভুয়া চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাঁদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Published by the Editor from 24 Shantibagh, Dhaka-1217; Commercial Office: Roni House, 153 C/A, Motijheel, Dhaka-1000. Mobile: 09697266156 /Watsapp 01349-657644.  E-mail: news.dailynababani@gmail.com

প্রিন্ট করুন