প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

কাশিমপুরে বিডিএস অফিস ঘিরে চাঁদাবাজি, তথ্য সংগ্রহে গিয়ে বিএনপি নেতা কতৃক মারধরের শিকার সাংবাদিক

স্বপন চন্দ্র দাস, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি

গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর থানাধীন দক্ষিণ পানিশাইলের পলাশ হাউজিং-সংলগ্ন ভূমি জরিপ (বিডিএস) কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা ঘুষ-বাণিজ্য ও বেপরোয়া চাঁদাবাজির তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একদল সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা, বর্বরোচিত মারধর, গলা চেপে হত্যাচেষ্টা এবং পরবর্তীতে প্রাণনাশের হুমকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই চাঞ্চল্যকর ও ন্যাক্কারজনক ঘটনায় মো. সাইফুল ইসলাম সরকারসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে কাশিমপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক মো. রমজান মিয়া (৫২)। দায়েরকৃত ওই অভিযোগে মো. সাইফুল ইসলাম সরকার (৪০), মো. আব্দুর রহিম (৩৫), মো. আশরাফুল ইসলাম (৪০) এবং অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজন বহিরাগতকে বিবাদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিযোগকারীদের সুনির্দিষ্ট দাবি, প্রধান অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম সরকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে এলাকায় চরম প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তাদের জোরালো অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই সাইফুল ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে তার একাধিক অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে সাইফুল ইসলাম সরকার নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে নিজেকে কাশিমপুর থানা বিএনপির একজন অতি সক্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এমনকি সম্প্রতি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারের সঙ্গে তার একটি ফটোসেশনও স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দক্ষিণ পানিশাইলের পলাশ হাউজিং-সংলগ্ন সেটেলমেন্ট বা বিডিএস অফিসে ভূমি জরিপ ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কাজকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের জোরালো দাবি, নব্য বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম সরকার, আব্দুর রহিম ও আশরাফুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনের একটি শক্তিশালী চক্র ওই এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে এই ঘুষ-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এই বিডিএস অফিসটিকে কেন্দ্র করে চক্রটি নিয়মিত সাপ্তাহিক চাঁদা আদায় করত এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তাদের এই অবৈধ ঘুষ-বাণিজ্যের সাম্রাজ্য কায়েম করেছিল।

সাংবাদিক রমজান মিয়ার দায়ের করা লিখিত অভিযোগের রোমহর্ষক বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর (২০২৬), বৃহস্পতিবার, দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে তিনি তার অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে দক্ষিণ পানিশাইলের ওই বিতর্কিত বিডিএস কার্যালয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল সেখানে চলমান অনিয়ম, দুর্নীতি ও কথিত চাঁদাবাজির বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করা। অভিযোগে স্পষ্টভাবে বলা হয়, তথ্য সংগ্রহের একপর্যায়ে সাইফুল ইসলাম সরকার, আব্দুর রহিম, আশরাফুল ইসলামসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন বহিরাগত সাংবাদিকদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে তাদের ওপর অতর্কিত ও সন্ত্রাসী স্টাইলে হামলা চালান। তাদের এলোপাতাড়ি মারধরে উপস্থিত সাংবাদিকদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাত ও জখম হয়। হামলার একপর্যায়ে সাইফুল ইসলাম সরকার ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিক রমজান মিয়ার গলা চেপে ধরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ১০ মিনিটের মধ্যে এলাকা ছেড়ে না গেলে সাংবাদিকদের চিরতরে শেষ করে দেওয়ার প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর এমন ন্যক্কারজনক হামলা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক সমাজের নেতৃবৃন্দ ও সুশীল সমাজ। বিষয়টি ইতিমধ্যে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) সর্বোচ্চ মহলের নজরে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে জিএমপি কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা মানে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। কাশিমপুরের বিডিএস অফিসে দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়া এবং সাংবাদিকদের হত্যার হুমকির এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির শেকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি করছে এবং সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

Published by the Editor from 24 Shantibagh, Dhaka-1217; Commercial Office: Roni House, 153 C/A, Motijheel, Dhaka-1000. Mobile: 09697266156 /Watsapp 01349-657644.  E-mail: news.dailynababani@gmail.com

প্রিন্ট করুন