রাজশাহীতে একটি ফ্ল্যাট থেকে মাহবুব আলম নামে এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এক নারীসহ আটক হয়েছেন। নগরীর নাদের হাজির মোড় এলাকার একটি ফ্ল্যাটে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) এ ঘটনা ঘটে। পরে ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ডাকাডাকি করেও ফ্ল্যাটের দরজা খোলা হয়নি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন। ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব আলম ও ওই নারীকে নগরীর চন্দ্রিমা থানায় নিয়ে যায়।
জানা গেছে, মাহবুব আলম ২০২৪ সালে চন্দ্রিমা থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় এক ব্যক্তির কাছ থেকে খাম নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে চন্দ্রিমা থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তিনি নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন।
নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত থাকা অবস্থায় মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপর তাকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়। তবে প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে কোনো ছুটি বা অনুমতি না নিয়েই তিনি রাজশাহীতে এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রটির কমান্ড্যান্ট।
নারীসহ আটক হওয়া মাহবুব আলমের কথিত পালিত মেয়ের নামে নাদের হাজির মোড়ের ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সেখানে তার মেয়ে ও জামাই থাকেন। তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ওই ফ্ল্যাটে মাহবুব আলম ও ওই নারী অবস্থান করছিলেন। ওই নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
মাহবুব আলম দাবি করেন, ওই নারী তার স্ত্রী। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো কাবিননামা দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী বলে দাবি করেন। মাহবুবের দাবি, আন্নিকে চারদিন আগে তিনি তালাক দিয়েছেন।
নওগাঁর বাসিন্দা আন্নি আক্তার একজন নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা। তার অভিযোগ, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, মাহবুব যে জেলায় যান, সেখানেই বিয়ে করেন এবং একাধিক নারীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আন্নি জানান, রাজশাহীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুবের নিজস্ব একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর আগে সেখানে মাহবুবের সঙ্গে ওই নারীকে দুদিন পেয়েছিলেন তিনি। তখন সামাজিক ও পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি প্রকাশ করেননি।
আন্নির ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জানতে পারেন, মাহবুব তার কথিত পালিত মেয়ের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে গেছেন এবং সেখানে ওই নারীও রয়েছেন। খবর পেয়ে শুক্রবার সকাল ৭টায় তিনি ওই ফ্ল্যাটে যান। দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন।
পরে চন্দ্রিমা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তবে ভেতরে মাহবুব রয়েছেন জানতে পেরে পুলিশ দরজা ভাঙেনি বলে দাবি করেন আন্নি। পরে তিনি ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে দরজা ভেঙে দেন।
আন্নির দাবি, এর মধ্যে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় মাহবুব ও ওই নারী ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে ছিলেন। পুলিশ ফোন করে দরজা খুলতে বললেও মাহবুব দরজা খোলেননি। দরজা খোলার পর মাহবুব ওই নারীকে তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। পরে পুলিশ দুজনকে থানায় নিয়ে যায়।
থানায় নেওয়ার সময় মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আন্নিকে তালাক দিয়েছেন। পুলিশের কাছে তালাকের একটি কাগজও জমা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে ওই নারীর সঙ্গে বিয়ের কাবিননামা তিনি দেখাতে পারেননি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চারদিন আগে আন্নিকে তালাক দেওয়ার একটি কাগজ মাহবুব আলম দিয়েছেন। তবে আন্নি জানিয়েছেন, তিনি তালাকের কোনো কাগজ হাতে পাননি।
এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন আন্নি। শুক্রবার দুপুরে অভিযোগ লেখার কাজ শুরু হয়। এ সময় মাহবুব আলম ও ওই নারীকে থানার পৃথক দুটি কক্ষে রাখা হয়। মাহবুবের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবিও জানান আন্নি।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, মাহবুব আলম ও ওই নারীর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসবেন। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ বলেন, তিনি ঘটনাটি জেনেছেন। মাহবুব আলমের কোনো ছুটি নেই এবং কাউকে জানিয়েও তিনি রাজশিয়ায় যাননি। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করাও অপরাধ।
তিনি বলেন, মাহবুব আলম ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক :