সরকারি হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (শজিমেক) তা কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২০ জনের একটি শক্তিশালী দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ ও প্রান্তিক রোগীরা।
জানা গেছে, চলতি বছরের (২০২৬ সাল) সেপ্টেম্বরে শজিমেক হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮০০ করার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় এবং বর্ধিত শয্যাগুলোতে চিকিৎসাসেবা চালুর অনুমতি মেলে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী এখানে আসেন, যার বেশিরভাগই গ্রামঞ্চলের দরিদ্র মানুষ। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে সক্রিয় দালাল চক্র।
ক্লিনিকে নিয়ে প্রতারণা ও অতিরিক্ত বিল
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের আশপাশে দিগন্ত, সেবা ও এশিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। হারুন, আনোয়ার, দুলু, রবিউল ও মামুনসহ প্রায় ২০ জনের একটি চক্র এসব ক্লিনিকের হয়ে কাজ করছে। তারা গ্রামের সহজ-সরল রোগীদের ভালো চিকিৎসকের প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে রোগীদের ধরিয়ে দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের বিল।
ধুনট উপজেলার মরিয়ম বেগম নামের এক রোগীর স্বজন জানান, পেটে পাথরের অপারেশনের জন্য হাসপাতালে ভর্তির পর দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে তিনি একটি ক্লিনিকে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দরিদ্র রোগীরা যাতে এভাবে প্রতারিত না হন, সে বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ওষুধের সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি
অফিসিয়াল সময় শেষ হওয়ার পর বিকেলবেলা হাসপাতাল এলাকায় দালালদের তৎপরতা আরও বাড়ে। জরুরি বিভাগ থেকে কম দামে ওষুধ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তারা রোগীদের নিজস্ব ফার্মেসিতে নিয়ে চড়া দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য করেন।
এছাড়া হাসপাতালের রেকর্ড রুমের এক কর্মকর্তা জানান, বিধিমোতাবেক সরকারি হাসপাতালের দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকার কথা না থাকলেও শজিমেকের কয়েকশ গজের মধ্যেই সাতটি ক্লিনিক ও অসংখ্য ওষুধের দোকান গড়ে উঠেছে, যার অনেকেরই বৈধ লাইসেন্স নেই। পাশাপাশি, বিভিন্ন ওয়ার্ড ইনচার্জদের বিরুদ্ধে সরকারি ওষুধ কালোবাজারে বিক্রি এবং অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) সরঞ্জাম চড়া দামে কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরে ‘ডক্টর’ নামের একটি ক্লাবে চিকিৎসকরা সময় কাটালেও সেবা পেতে রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। দিনমজুর আমিনুল প্রামানিক জানান, সরকারি হাসপাতালে এসেও তাকে প্রতিদিন বাইরে থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. মনজুর-এ-মুর্শেদ বলেন, “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় দালালদের সরাসরি আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সম্প্রতি ৮ দালালকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন ও র্যাবকে জানানো হয়েছে। অননুমোদিত প্রবেশ রোধে রোগী প্রতি দুজন দর্শনার্থীর জন্য গেটপাস চালু করা হয়েছে এবং আনসার সদস্যদের কড়া নজরদারি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত আনসার সদস্য মোতায়েন করা গেলে এই দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া: