প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

তিতাসে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ

শেখ জুনায়েদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

বহু বছর পর নানা প্রতিকূলতা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। দীর্ঘ বিরতির পর প্রাণের এই আয়োজন দেখতে তিতাসের দুই তীরে জড়ো হন লাখো মানুষ। দর্শকদের করতালি, মাঝিদের ভাটিয়ালি গান আর বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে তিতাসপাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার শিমরাইলকান্দি গাঁওগেরাম পয়েন্ট থেকে এ নৌকা বাইচ শুরু হয়। প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌর এলাকার মেড্ডা সরকারি শিশু পরিবার এলাকায় গিয়ে প্রতিযোগিতা শেষ হয়।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, বিজয়নগর ও নবীনগরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মোট ১০টি নৌকা অংশ নেয়। তিনটি ধাপে যথাক্রমে ৩টি, ৩টি ও ৪টি নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি ধাপ থেকে একটি করে মোট তিনটি নৌকা চূড়ান্ত পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

বিকেল সাড়ে ৩টায় শিমরাইলকান্দি গাঁওগেরাম পয়েন্টে বেলুন উড়িয়ে নৌকা বাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহবুব শ্যামল।

উদ্বোধনের পর রং-বেরঙের বাহারি পোশাকে সজ্জিত মাঝিরা সুসজ্জিত নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মাঝিদের ভাটিয়ালি গান এবং পানিতে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তিতাসের দুই পাড়ের দর্শনার্থীরাও উচ্ছ্বাসে মাঝিদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান—‘মারো টান, হেইয়ারে হেইয়াহো।’

আয়োজকরা জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে টানা দুই বছর এ ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর এবারের আয়োজন ঘিরে শুরু থেকেই দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহবুব শ্যামল। অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন, জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহ্ মো. আব্দুর রউফ, পৌর প্রশাসক শরিফুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোমানা আক্তার এবং চিকিৎসক মো. আব্দুল মতিন।

চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে সদর উপজেলার ‘শাপলা ভয়েস ক্লাব’। দলটি পায় দুই লাখ টাকা। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সদর উপজেলার ‘দারমা গ্রামের নৌকা’, তারা পায় দেড় লাখ টাকা। তৃতীয় স্থান অধিকার করে নবীনগরের ‘পুইল যুব সংঘ’, তাদের দেওয়া হয় এক লাখ টাকা।

এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক দলকে নগদ ৩০ হাজার টাকা ও ট্রফি দেওয়া হয়।
নৌকা বাইচ দেখতে তিতাস নদীর দুই তীরে প্রায় লক্ষাধিক দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। কেউ নদীর পাড়ে, কেউ বিভিন্ন ঘাটে, আবার কেউ আশপাশের ভবনের ছাদ কিংবা নৌযানে বসে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে দিনভর তিতাস নদীর পাড়জুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ থাকার পর নৌকা বাইচের আয়োজন ঘিরে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। দর্শনার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণে ভবিষ্যতে প্রতিবছরই এ ঐতিহ্যবাহী আয়োজন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহবুব শ্যামল বলেন, “বিএনপি সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, প্রতিবছর এই খেলার আয়োজন করা হবে।” তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয়। এ জেলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। খেলাধুলা মানুষকে বিভিন্ন খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি শরীর ও মন ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

খেলা শেষে প্রতিযোগী ও বিজয়ী দলগুলোর হাতে পুরস্কার, নগদ অর্থ ও ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচে অংশ নিতে পেরে প্রতিযোগীদের মধ্যে যেমন আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যায়, তেমনি নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির এই আয়োজন ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন দর্শনার্থীরাও।

Published by the Editor from 24 Shantibagh, Dhaka-1217; Commercial Office: Roni House, 153 C/A, Motijheel, Dhaka-1000. Mobile: 09697266156 /Watsapp 01349-657644.  E-mail: news.dailynababani@gmail.com

প্রিন্ট করুন