প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

বৃক্ষায়নে গৌরনদী মডেল, ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে ১৫ হাজার বৃক্ষ

গৌরনদী প্রতিনিধি মোঃ শরীফ সুজন

গৌরনদী (বরিশাল), ১০ সেপ্টেম্বর: ‘আজকের চারা, আগামী দিনের ছায়া’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বরিশালের গৌরনদীতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ব্যতিক্রমী বৃক্ষায়ন কর্মসূচি ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে পর্যায়ক্রমে ১৫ হাজার ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) উপজেলার ৩২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৃতীয় পর্যায়ে ৫ হাজার ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব চারা সরবরাহ করা হয়।

শুধু চারা বিতরণ নয়, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তার বরাদ্দ করা গাছের ‘বৃক্ষ অভিভাবক’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় উপযুক্ত স্থানে চারা রোপণ, নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা এবং গাছকে গবাদিপশু ও অন্যান্য ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে হবে।

এর আগে কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তাঁর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে গৌরনদীতে ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে গৌরনদী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে চারা বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক মোঃ মামুন খন্দকার। শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনে তখন থেকেই উৎসাহিত করা হয়।

তৃতীয় পর্যায়ে ৩২টি বিদ্যালয়ে একসঙ্গে ৫ হাজার চারা বিতরণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচিটির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃক্ষপ্রেম ও পরিবেশসচেতনতা তৈরি করা এবং ছোটবেলা থেকেই তাদের প্রকৃতি সংরক্ষণে দায়িত্বশীল করে তোলা।

কর্মসূচিটির বিশেষ দিক হলো, চারা বিতরণের পরই কার্যক্রম শেষ হবে না। প্রতিটি চারার জন্য থাকবে একটি স্বতন্ত্র নম্বর। ওই নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় ও গাছের প্রজাতির তথ্য সংযুক্ত থাকবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে সংরক্ষণ করা হবে ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’ রেজিস্টার।

রেজিস্টারে শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি, রোল, গাছের নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, রোপণের স্থান এবং গাছের বৃদ্ধি ও পরিচর্যার তথ্য লিপিবদ্ধ করা হবে। ফলে কোন শিক্ষার্থীর গাছ কোথায় রোপণ করা হয়েছে এবং সেটি কীভাবে বেড়ে উঠছে, তার একটি ধারাবাহিক হিসাব রাখা সম্ভব হবে।

কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের শুধু গাছ লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার নিজের গাছ সম্পর্কে জানতেও উৎসাহিত করা হবে। গাছটির আঞ্চলিক ও প্রমিত বাংলা নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, ফলজ বা ঔষধি গুণ এবং পরিচর্যার নিয়ম সম্পর্কে জানতে হবে।

এর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে ব্যবহারিক পরিবেশ শিক্ষার অংশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নিজের হাতে লাগানো একটি গাছের বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান তৈরি হবে।

চারা রোপণ ও পরিচর্যায় প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে উপজেলা কৃষি অফিস। সংশ্লিষ্ট ব্লক সুপারভাইজারদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গর্ত প্রস্তুত, মাটি ও জৈবসারের ব্যবহার, পানি প্রয়োগ, আগাছা দমন, গাছের সুরক্ষা এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে।

এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হবে, যাতে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পরিবারেও পরিবেশবান্ধব মনোভাব তৈরি হয়।

কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর বৃক্ষকে মাসিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১০ নম্বরে মূল্যায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। গাছের সুস্থতা, পরিচর্যা, বৃদ্ধি, গাছের পরিচয় ও বৈজ্ঞানিক নাম জানা, ফলজ বা ঔষধি গুণ সম্পর্কে জ্ঞান, গাছের সুরক্ষা এবং অন্যদের বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার বিষয়গুলো মূল্যায়নে রাখা হবে।

১২ মাসে সর্বোচ্চ ১২০ নম্বরের ভিত্তিতে হবে বার্ষিক মূল্যায়ন। বছর শেষে প্রতিটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে ‘বিদ্যালয়ের সেরা বৃক্ষপ্রেমী’ হিসেবে নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাকে সনদ, বিশেষ পুরস্কার এবং বৃক্ষচারা বা বাগান কিট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে উপজেলা পর্যায়েও ‘গৌরনদীর সেরা বৃক্ষপ্রেমী শিক্ষার্থী’ নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে।

গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মোঃ ইব্রাহিমের সার্বিক সমন্বয়ে পরিচালিত এ কর্মসূচিতে সহযোগিতা করছে উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস, সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মসূচির প্রয়োজনীয় চারা সরবরাহ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিশুর হাতে একটি চারা তুলে দেওয়া মানে শুধু একটি বৃক্ষ রোপণ নয়; বরং তার হাতে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের যত্নে বেড়ে ওঠা এসব গাছ ভবিষ্যতে ফল, ছায়া ও অক্সিজেন দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দীর্ঘমেয়াদে প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির আওতায় এনে এটিকে একটি চলমান উদ্যোগে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’ থেকে ‘একটি পরিবার, একটি বাগান’ এবং ‘একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সবুজ বনায়ন’ এই ধারায় কর্মসূচি সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে জহির উদ্দিন স্বপনের উদ্বোধন, দ্বিতীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসক মোঃ মামুন খন্দকারের অংশগ্রহণ এবং তৃতীয় পর্যায়ে ৩২টি বিদ্যালয়ে ৫ হাজার চারা বিতরণের মধ্য দিয়ে গৌরনদীতে কর্মসূচিটি ধাপে ধাপে বিস্তৃত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আজকের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া এসব চারা একদিন বড় বৃক্ষে পরিণত হবে। সেই বৃক্ষের সঙ্গে বেড়ে উঠবে একটি পরিবেশসচেতন প্রজন্ম। শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য গৌরনদী।

স্লোগান: ‘আজকের চারা, আগামী দিনের ছায়া।’

Published by the Editor from 24 Shantibagh, Dhaka-1217; Commercial Office: Roni House, 153 C/A, Motijheel, Dhaka-1000. Mobile: 09697266156 /Watsapp 01349-657644.  E-mail: news.dailynababani@gmail.com

প্রিন্ট করুন