ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডেমরা থানার ৬৭ ও ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক গুঞ্জন ও নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সাধারণ ভোটারদের মনস্তত্ত্বে বড় ধরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডে ডেমরা থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এম রেজা চৌধুরী সেলিম। রাজপথের এই ত্যাগী নেতা আগামী কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা যায়, বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃসময়ে ডেমরা থানা এলাকায় বিএনপির সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তিনি অসংখ্য মামলা, হামলা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। নটরডেম কলেজে অধ্যয়নকালীন সময় থেকেই ছাত্র রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকা এই নেতা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়।
অন্যদিকে, পাশ্ববর্তী ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচনে ডেমরা থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ আনিসুজ্জামান (জামান) স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ও সাধারণ ভোটারদের মাঝে একটি অত্যন্ত পরিচিত মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এই প্রবীণ নেতা বিগত সরকারের আমলে একাধিক রাজনৈতিক মামলা, কারাবরণ এবং নানা ধরণের মানসিক ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। দলের চরম দুঃসময়ে তিনি ডেমরা ও সারুলিয়া এলাকার সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংকটে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফলে ডেমরা থানা বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর প্রতি একটি শক্তিশালী গ্রহণযোগ্যতা ও গভীর আস্থা গড়ে উঠেছে, যা তাঁকে নির্বাচনী দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে রাখছে।
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোঃ আনিসুজ্জামান (জামান) ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের থানা আহ্বায়ক এস এম রেজা চৌধুরী সেলিমকে সাথে নিয়ে এলাকায় বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক, উন্নয়নমূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি গতিশীল ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এলাকার দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন বন্ধ খাল ও ড্রেন পরিষ্কারকরণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কর্মসূচি, পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষরোপণ এবং চরম অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র ও খাদ্য সহায়তা প্রদানের মতো সামাজিক উদ্যোগে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া সমাজ থেকে মাদক নির্মূল এবং উঠতি বয়সী কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা প্রতিরোধেও তাঁকে অগ্রভাগে দেখা যাচ্ছে। এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ীদের মতে, একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— ঐতিহ্যবাহী সারুলিয়া বাজারের ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে তিনি এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে যেখানে একটি দোকান সামান্য মেরামত করতে গেলেও স্থানীয় সিন্ডিকেটকে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হতো এবং উচ্ছেদের নামে মোটা অঙ্কের টাকা তোলা হতো, সেখানে আনিসুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ নির্ধারিত চাঁদার হার এক ধাক্কায় কমিয়ে দিয়েছেন। আগে যেখানে ২০০ টাকা নেওয়া হতো, এখন সেখানে মাত্র ১৫০ টাকা নেওয়া হয়, এবং আগে যারা ১০০ টাকা দিতেন, তাঁরা এখন মাত্র ৫০ টাকা দিচ্ছেন।
এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ ভোটাররা আনিসুজ্জামানকে রাজনৈতিক নেতার চেয়ে পরিবারের একজন আপন সদস্যের মতো মনে করেন। যেকোনো সামাজিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাঁর কাছে গেলে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি শোনেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেন। এসব কারণে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে তাঁকে একজন অত্যন্ত শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভোটারদের একাংশের ধারণা, বর্তমান জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে বিএনপির একক প্রার্থীর কোনো বিকল্প নেই। তবে কাঙ্ক্ষিত বিজয় নিশ্চিত করতে হলে বিএনপিকে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং একক প্রার্থীকে দলের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থন দিতে হবে।
অন্যদিকে, এই ওয়ার্ডে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী মোহাম্মদ আলীও রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনায় রয়েছেন। তবে স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশের দাবি, ৫ আগস্টের আগে সাধারণ জনগণের মাঝে কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে তাঁর তেমন কোনো পরিচিতি ছিল না এবং বিগত সরকারের আমলেও এলাকার কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বা বিপদে-আপদে সাধারণ মানুষের পাশে তাঁকে দেখা যায়নি। এমতাবস্থায় সাধারণ ভোটারদের একাংশ মনে করছেন, জামায়াত প্রার্থীকে নির্বাচিত করলে এলাকার দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হবে না, কারণ তাঁদের মতে বর্তমান সরকারের অধীনে জামায়াত প্রার্থী কেবল সরকারের সমালোচনা করতেই ব্যস্ত থাকবেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজের বরাদ্দ আনতে পারবেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সমর্থনের কারণে মোহাম্মদ আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকলেও সাধারণ ভোটারদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে এবং তৃণমূলের সাংগঠনিক উপস্থিতির ক্ষেত্রে তাঁকে এখনও অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনী মাঠের আলোচনায় আনিসুজ্জামান (জামান) তুলনামূলকভাবে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন। তবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা এবং প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর চূড়ান্ত সমীকরণে নতুন কোনো মোড় আসতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
ডিএসসিসির ডেমরা অঞ্চলের ৬৭ ও ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে। মাদক, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনে আনিসুজ্জামান (জামান) ও রেজা চৌধুরী সেলিমের মতো পরীক্ষিত ও সমাজসেবক নেতাদের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, যা ডেমরার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

বায়েজিদ আহমেদ